চীন তাঁর পশ্চিমাংশে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে নাগরিকদের উপর নজরদারি অব্যহত রেখেছে।

চীনের সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর চলমান নৃশংসতার বর্ণনা করে সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্ট একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। পত্রিকাটির অন্যতম সম্পাদক ফ্রেড হিয়াট নিবন্ধটি লিখেছেন। এতে তিনি দাবি করেছেন, চীনে প্রায় দশ মিলিয়নেরও বেশি উইঘুর মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুরা নিয়মিত নির্যাতিত হচ্ছেন।

১৯ এপ্রিল, ২০২১, সোমবার -নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়। চলমান এই নৃশংসতায় উইঘুর মুসলিমদের শতাধিক মসজিদ এবং কবরস্থানও ধ্বংস করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়।

প্রকাশিত নিবন্ধে চীনা বাহিনীর বিরুদ্ধে মহিলাদের জোর পূর্বক গর্ভপাত করানো এবং বাচ্চাদেরকে জোরপূর্বক অপহরণ এর মতো গুরুতর অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি পুরুষদের ক্ষেত্রে দাড়ি রাখলে কিংবা শুকরের মাংস অথবা অ্যালকোহল সেবন করতে অস্বীকার করলে চরম নির্যাতন, তথা জেলে প্রেরণ এর কথা উল্লেখ করা হয়।

ফ্রেড দাবি করেন, চীনা কমিউনিস্টরা উইঘুর মুসলিমদের সংস্কৃতি, জীবনযাত্রার ধরণ তথাপি গোটা সমাজব্যবস্থাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পায়তারা করছে। তাঁর ভাষ্যমতে, চীন এই গণহত্যা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে এবং যারা সত্যকে সামনে আনতে চায়, তাঁদের উপর কঠোর নির্যাতন এবং বিধি নিষেধ আরোপ করেছে।

কিন্তু এই কঠোর বিধি নিষেধ উপেক্ষা করেও যারা সত্য প্রচার করে চলেছেন, সাহসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন, ফ্রেড তাঁদেরকে ধন্যবাদ জানান এবং তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলনে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, উইঘুর নিয়ে সত্য প্রকাশ্যে আনা অনেককে মিথ্যাবাদী, অপরাধী, সন্ত্রাসবাদী এবং খারাপ নৈতিকতার ব্যক্তি বলে আক্রমণ করেছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট ঘটনার সরেজমিনে তদন্ত করতে গিয়ে, ভুক্তভোগী একজনের সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম হয়। সত্য প্রকাশ করার অপরাধে অপরাধী ব্যাক্তিটির নাম হ্যাজা (৪৮)। কথা বলতে গিয়ে জানা যায়, হ্যাজার পিতা আবদুকেয়াম হ্যাজাকেও সন্ত্রাসবাদী হিসেবে তালিকাভূক্ত করেছে চীনের সরকারী বাহিনী।

হ্যাজা সম্পর্কে ফ্রেড তাঁর নিবন্ধে লিখেছেন, “হ্যাজা চীনের জিনজিয়াং টেলিভিশনের একটি শিশুবিষয়ক প্রোগ্রামের জনপ্রিয় উপস্থাপিকা ছিলেন। তিনি দরিদ্র উইঘুর বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা করে উপলব্ধি করেন যে তাঁরা কতোটা বৈষম্য মূলক আচরণের শিকার হচ্ছে! চীনা বাহিনী এসব শিশুদের অনেককে অপহরণ করছে। তাঁদেরকে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্ম তথা পরিবার থেকে দূরে রাখতে জোর পূর্বক চীনের মূল ভূখণ্ডে পাঠাচ্ছে। আত্মোপলব্ধি থেকে তিনি এই মানুষ গুলোর জন্য কিছু করতে চাচ্ছিলেন। এমন সময় ঘটনাক্রমে তিনি এন্টি-কমিউনিস্ট প্রচারণার জন্য বিখ্যাত রেডিও ফ্রী এশিয়া সম্পর্কে জানতে পারেন এবং তাঁর নিজ জন্মভূমিতে চলমান নির্যাতনের কথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।”

ফ্রেড হ্যাজার ব্যাপারে আরও লিখেছেন, “হ্যাজা শীঘ্রই উপলব্ধি করেন চীনে অবস্থান করে চীনা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা অসম্ভব। এজন্য তিনি দেশত্যাগ করেন। ২০০১ সালে তিনি আমেরিকায় চলে আসেন এবং রেডিও ফ্রী এশিয়াতে কাজ শুরু করেন।”

হ্যাজার এই সাহসী পদক্ষেপের চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছিলো তাঁর পরিবারকে। হ্যাজা দেশ ত্যাগের পরপরই তাঁর বাবাকে চাকরী থেকে বরখাস্ত করা হয়, তাঁর পরিবারের সবার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং তাঁর বাবা-মা সহ প্রায় ২৩ জন নিকটাত্মীয়কে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর ছোট ভাইকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয় এবং পরিবারের সঙ্গে হ্যাজার সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়।

ফ্রেড তাঁর নিবন্ধে লিখেছেন, রেডিও ফ্রী এশিয়ার প্রায় অর্ধ ডজনের বেশি চীনা সাংবাদিক তাঁদের সাহসি ভূমিকার শাস্তি হিসেবে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন।

নিজেদের উপর অত্যাচারের বর্ণনা করতে গিয়ে হ্যাজা ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছিলেন, প্রায় ২০ কোটি সংখ্যালঘু লোক প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের এই নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরার মতো কেউ নেই।

বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সরকার, বিশ্ব অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা প্রতিষ্ঠান সমূহ এবং ২০২২ অলিম্পিক এ অংশ নিতে যাওয়া ক্রীড়াবিদ ও স্পন্সরদের তিনি উইঘুর মুসলিমদের সমর্থনে সরব ভূমিকা নেয়ার আহ্বান জানান।