মহামারীর দরুণ সৃষ্ট সঙ্কট এবং ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা ভারতীয় কূটনীতিতে বড় ধরণের প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা।

করোনা মহামারীর কারণে তৈরি হওয়া নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ভারত স্বীয় পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে বহির্বিশ্বের উন্নতিতে ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। ২৯ এপ্রিল, ২০২১, বৃহস্পতিবার, সিম্বিওসিস স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ আয়োজিত “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্মেলন-২০২১” -এর উদ্বোধনী অধিবেশনে এ কথা বলেন তিনি।



জাতিগত পথচলার শুরু থেকেই ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতিতে স্বীয় জাতীয় স্বার্থ সর্বদা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়ে এসেছে মন্তব্য করে আসন্ন দশক গুলোতেও একই ধারা অব্যহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন শ্রিংলা। তিনি বলেন, “ভারত সবসময়ই পরিবর্তনের সঙ্গে ধারাবাহিকতায় বিশ্বাস করে এসেছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কে ধারাবাহিকতাও বজায় রাখতে হবে। ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি এ ধারা অক্ষুন্ন রাখবে।”



ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সর্বদাই দেশের ভূ-রাজনৈতিক স্থিরতা এবং অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চায়ন পূর্বক বহির্বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।



মহামারীর দরুণ সৃষ্ট সঙ্কট এবং ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা ভারতীয় কূটনীতিতে বড় ধরণের প্রভাব ফেলেছে জানিয়ে শ্রিংলা বলেন, “আমাদেরকে পুরোনো মিত্রদের সাথে অংশীদারিত্ব যেমন আরও জোরদার করতে হবে, তেমনই উদীয়মান শক্তিগুলোর সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তুলতে হবে।”



তাছাড়া পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের ‘প্রতিবেশীই প্রথম’ নীতির কোনো পরিবর্তন হবে না বলে জানিয়ে তিনি বলেন, “২০১৪ সাল থেকে এটি ভারতের পররাষ্ট্র এবং সুরক্ষা নীতির অন্যতম মূল ভিত্তি।” ২০১৪ সাল অবধি ভারত প্রতিবেশীদের উন্নয়নে ৩.২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিলেও, ২০২০ এ এর পরিমাণ ১৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে বলেও জানান শ্রিংলা।



এসময় বহির্বিশ্বের সব অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন শ্রিংলা।



প্রতিবেশীদের মাঝে বাংলাদেশ এবং নেপালের সঙ্গে চলমান রেলসংযোগ প্রকল্প স্থাপন, ইরানের সঙ্গে চাবাহার ও মায়ানমারের সঙ্গে সিটওয়ে বন্দর এর দ্রুত নির্মাণ সহ আভ্যন্তরীণ নৌ চলাচলে উন্নয়নের উদাহরণ টেনে শ্রিংলা বলেন, “প্রকল্প গুলো ভারতের সঙ্গে এ অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তের করিডোর হিসেবে কাজ করছে। দ্রুত পণ্য এবং লোকজন পরিবহণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যা আমাদের আভ্যন্তরীণ উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে।”



হাইড্রোকার্বন পাইপলাইন ভারত এবং নেপালকে সংযুক্ত করছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র সচিব মন্তব্য করেন, “ভারতের এনার্জি গ্রিডগুলো বাংলাদেশ, ভূটান, নেপাল এবং মায়ানমারের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ, ভূটান এবং নেপালের বিদ্যুৎ প্রকল্পে আমরা বিনিয়োগ করেছি। এতে আমাদের যেমন লাভ হচ্ছে, তারাও উন্নয়নের পথে ধাবিত হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যহত থাকবে বলে আমি আশা প্রকাশ করছি।”



ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে শ্রিংলা বলেন, “ভারত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অঙ্গীকারবদ্ধ। অঞ্চলটিতে আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সচেষ্ট, পাশাপাশি নেট সুরক্ষা প্রদান সহ নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আমাদের প্রগতিশীল এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ভারত মহাসাগরীয় রিম এসোসিয়েশন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক মহাসাগরীয় উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে আসছি।”



ভারত আশিয়ান ভূক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্বীয় নীতির প্রতিফলন করছে বলে অভিমত দেন তিনি। তিনি জানান, “আশিয়ান ইন্ডিয়া সামিট, পূর্ব এশিয়া শীর্ষ সম্মেলনে, আশিয়ান আঞ্চলিক ফোরাম, এএসইএম, এডিএমএম+ এবং সম্প্রসারিত এশিয়ান মেরিটাইম ফোরামের মতো একাধিক প্ল্যাটফর্মে ভারত আশিয়ানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।”



এর পাশাপাশি ভারত স্বকীয়তা বজায় রেখে বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলোর সাথেও সম্পর্ক দৃঢ় করছে বলে সম্মেলনে মন্তব্য করেন শ্রিংলা। উদাহরণ স্বরূপ, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারীতে স্বাক্ষরিত ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন চুক্তি এবং রাশিয়ার সঙ্গে মহাকাশ সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন তিনি।



অন্যদিকে, ডেনমার্কের সঙ্গে জলবায়ু বিষয়ক ডিজিটাল সহযোগিতা ও সংযোগ চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের সঙ্গেও ভারত ক্রমাগত সম্পর্ক গড়ে তুলছে বলে অভিমত দেন শ্রিংলা।



তাছাড়া পারস্য উপসাগরীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জ্বালানি এবং অভিবাসন বিষয়ক কার্যক্রমের গতি নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।



এসময় জাপানকে তিনি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার উল্লেখ করে বলেন, “তাঁরা ভারতের অন্যতম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী। দেশটি আমাদের আহমেদাবাদ এবং মুম্বাইয়ের দ্রুতগতির রেল স্থাপন সহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রকল্প তৈরীতে সহযোগিতা করেছে এবং বন্ধুত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।”



আফ্রিকা মহাদেশীয় অনেক শিক্ষার্থী ভারতে নিয়মিত পড়াশোনা করছে এবং ভারত আফ্রিকার উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে জানিয়ে সেখানকার দেশগুলোর সঙ্গেও ভারত ক্রমাগত সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করে চলেছে মন্তব্য করেন শ্রিংলা।



বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের শক্ত কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরারও চেষ্টা করেছেন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, “আমরা বর্তমানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করছি। সে সঙ্গে সদ্য এসসিও-র সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। আমরা ব্রিকস এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। জি-২০ সম্মেলন আয়োজন সহ এবারের জি-৭ বৈঠকেও আমরা উপস্থিত থাকবো। তাছাড়া মহামারী মোকাবেলার ক্ষেত্রেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ভারত অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।”



ভারত তাঁর ‘সবার সঙ্গে সবার উন্নতি’ নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মন্তব্য করে শ্রিংলা বলেন, “অপারেশন সঞ্জীবনী এবং ভ্যাক্সিন মৈত্রীর মাধ্যমে ভারত আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। ১৫৪ টিরও বেশি দেশে ওষুধ এবং স্বাস্থ্য সরঞ্জাম সরবরাহ করে ভারত বিশ্বের ফার্মেসী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।”



নিজের প্রবাসী সন্তানদেরকেও সেবা দিতে ভারত বদ্ধপরিকর জানিয়ে শ্রিংলা বলেন, “সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ভারতীয়দের কোভিড সঙ্কটে সেবা দানের জন্য আমরা একটি ২৪*৭ সার্ভিস দেয়া কোভিড হেল্প সেল তৈরী করেছি। করোনার প্রথম এবং দ্বিতীয় -উভয় ধাপেই এটি বিশ্বব্যাপী ভারতীয়দের মেডিকেল সেবায় কাজ করে চলেছে। পাশাপাশি দ্বিতীয় ধাপে ভয়ানক পরিণতির প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যপী সাহায্যের জন্য জনমত গড়ে তোলা এবং সহায়তা সংগ্রহের জন্যেও আমরা একটি টীম গড়ে তুলেছি।



বিশ্ব মানবতার উন্নয়নে ভারত এক মহতি এবং কল্যাণকর ভূমিকা পালন করেছে জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন শ্রিংলা।