চীন করোনার উৎস লুকাতে চায় বলে অভিমত দিয়েছেন আমেরিকাস্থ হাডসন ইনস্টিটিউট এর ফেলো ড. সাতোরু নাগাও।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহানে প্রথম করোনা রোগ শনাক্ত হয়। পরে তা মহামারি আকারে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর গত দেড় বছরে করোনার ভয়াল থাবায় কাঁপছে পুরো বিশ্ব। প্রতিদিন সংক্রমণ এবং মৃতের সংখ্যা বাড়ছে হুহু করে। কিন্তু আজও ধোঁয়াশা রয়েছে করোনার উৎপত্তি স্থল নিয়ে। এতদিন পেরিয়ে গেলেও, এখন পর্যন্ত করোনার উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।



তবে করোনার উৎপত্তি নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত বেশ কিছু নথিতে ভাইরাসটিকে মনুষ্য সৃষ্ট বলে দাবি করা হয়েছে, যা নিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে চীন। ধারণা করা হচ্ছে, চীনের ‘উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি’ থেকেই উৎপত্তি ভাইরাসটির।



সর্বশেষ, গত ৩০ মে, রবিবার, ব্রিটিশ অধ্যাপক এঙ্গাস ডালগেলিশ এবং নরওয়ের বিজ্ঞানী ড. বিরজার সোরেনসেন এর যৌথ গবেষণালব্ধ নতুন প্রবন্ধের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ পত্রিকা ডেইলী মেইল জানিয়েছে যে, “করোনা ভাইরাসটির কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রাকৃতিক পূর্বপুরুষ নেই এবং চীনের উহান ল্যাবে ‘গেইন অফ ফাংশন’ প্রকল্পে কাজ করতে থাকা বিজ্ঞানীরা এটি তৈরী করেছেন।”



তাছাড়া, সম্প্রতি মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন সহ বিশ্বের খ্যাতনামা কিছু পত্রিকাতেও চীনের উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি ল্যাবে করোনার উৎপত্তি সম্পর্কিত কিছু অনুসন্ধানে মূলক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।



এমন বিশ্ব পরিস্থিতিতে চীনের প্রতি সন্দেহের তীর কেনো জোরালো, তা জানার চেষ্টা করেছিলো ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক। এ সম্পর্কে কথা হয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ জাপানী নাগরিক, বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসির হাডসন ইনস্টিটিউট এর ফেলো ড. সাতোরু নাগাও এর সঙ্গে। বিশেষ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক প্রতিনিধি অঞ্জলি কোচর।



কথোপকথনের শুরুতেই নাগাও বলেন, “প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর এজন্যেই আমরা চাইলেও এখনই ভাইরাসের প্রকৃত উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে জানতে পারবোনা।”



তবে তিনি তিনটি বিশেষ কারণ উল্লেখ করেছেন, যা চীনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে। তাঁর ভাষায়, “প্রথমত, অন্যান্য দেশের তুলনায় চীনে করোনা রোগীর হার অত্যন্ত কম। দ্রুতই তাঁরা সংক্রমণের হার শুন্যের কোটায় আনতে সক্ষম হয়। চীন কী মহামারী সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানে যা আমরা জানিনা?”



দ্বিতীয় কারণ হিসেবে নাগাও বলেন, “সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া যখন করোনার উৎপত্তি নিয়ে স্বাধীন তদন্তের আহবান জানায়, চীন এর বিরোধীতা করতে থাকে এবং অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিতে আরম্ভ করে। যা চীনের বিরুদ্ধে সন্দেহের তীরকে প্রকট করে তোলে।”



নিজের তৃতীয় ও শেষ কারণ হিসেবে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “বিশ্ব যখন করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত, চীন তখনও তাঁর দখলদারিত্বের মনোভব থেকে বেরোয়নি। চীন ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক অভিযান বাড়িয়েছে। হংকং-এ জোরজবরদস্তি চালিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরেও গতিবিধি বাড়িয়েছে তাঁরা। এমনকি তাইওয়ানে হামলার হুমকিও দেয় তাঁরা। ওদিকে, ভারতের অভ্যন্তরেই প্রবেশ করে গালওয়ান উপত্যকায় সহিংসতা ঘটায়, যেখানে প্রায় ২০ জন সাহসী ভারতীয় জওয়ান শহীদ হন। এর সবই করোনা মহামারী চলাকালে চীনের এমন ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।”



তবে উল্লেখ্য যে, বিশ্ব মিডিয়া এবং বিশেষজ্ঞদের এমন অভিযোগ শুরু থেকেই ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছে চীন। সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান বলেছেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বাধীন তদন্ত দল গত ফেব্রুয়ারিতে উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে তদন্ত দল এ মর্মে উপসংহারে আসে যে ল্যাব থেকে করোনা ছড়ানো সম্ভাবনা একেবারেই অসম্ভব।” জিনপিং প্রশাসন কড়া সুরে জানায়, “আমেরিকা ক্রমাগত 'ল্যাব-লিক থিওরি'-কেই প্রাধান্য দিচ্ছে। এটা সঠিক তদন্ত নাকি নজর অন্যত্র ঘোরানোর চেষ্টা?”



চীন কেনো এমন দোষারোপের খেলায় মজেছে জানতে চাইলে নাগাও বলেন, “ভুল করে গোপন করা চীনের পুরোনো অভ্যেস।” একই সঙ্গে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তির খেলায় ভারসাম্য আনতে চীন ভাইরাসটি ছড়িয়ে থাকতে পারে বলে অভিমত দেন এই প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ। তবে যদি উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে চীন করোনার উৎপত্তি ঘটিয়ে থাকে, তাহলে সেটা ‘গুরুতর অপরাধ’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।



প্রসঙ্গত, করোনায় এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ১৮ কোটির বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন। মারা গেছেন প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি মানুষ।