মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতা অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে।

করোনার উৎপত্তি রহস্য নিয়ে শুরু থেকেই মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পর জো বাইডেন প্রশাসনও করোনার উৎপত্তিস্থল হিসেবে ‘উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি’ -কে অভিযুক্ত করে আসছে। অন্যদিকে বরাবরের মতোই এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ এবং ‘ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার ষড়যন্ত্র’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে জিনপিং প্রশাসন।



দু দেশের মধ্যকার এমন প্রতিযোগিতায় বদলে যেতে পারে ভবিষ্যত পৃথিবীর গতিবিধি। এমনটিই আশঙ্কা করছেন ওয়াশিংটন ভিত্তিক হাডসন ইনস্টিটিউট এর ফেলো, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ জাপানী নাগরিক ড. সাতোরু নাগাও। এমন পরিস্থিতিতে, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত কোয়াড জোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে অভিমত তাঁর।



ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্ককে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নাগাও বলেন, “যদি যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকে, তবে চীন তাঁর প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহকে উস্কে দেয়ার পুরোনো প্রচেষ্টা বাড়িয়ে দিবে। স্বভাবতই আমেরিকা এমনটি করতে চাইবেনা। কিন্তু চীন নিজেদের প্রয়োজনে জাপান এবং ভারতের বিরুদ্ধে উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে চাইবে। ইতোমধ্যে ভারতে তাঁরা সেটি করেও দেখিয়েছে। তাই এখনই চীনকে থামাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”



মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতাটি অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব ব্যবস্থার গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে বলে এসময় আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এক্ষেত্রে কোয়াডভূক্ত দেশগুলোর বড় ধরণের ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকবে বলে অভিমত দেন এই বিশেষজ্ঞ।



উল্লেখ্য, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত কোয়াড একটি অনানুষ্ঠানিক জোট। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে খর্ব করে আইনভিত্তিক সম-অধিকার প্রতিষ্ঠাই এই জোটের মূখ্য উদ্দেশ্য। চলতি বছর মার্চ মাসে সর্বশেষ কোয়াড শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। করোনা মহামারী থেকে উত্তরণে একত্রে কাজ করার ব্যাপারেও কোয়াড প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে, চীন সবসময়ই কোয়াডকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বর্ণনা করে এসেছে এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস প্রায়ই কোয়াড নিয়ে নেতিবাচক খবর প্রকাশ করে থাকে। এই বছরের শেষ নাগাদ কোয়াডের পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের কথা রয়েছে।



আসন্ন কোয়াড সম্মেলনকে ইঙ্গিত করে নাগাও বলেন, “কোয়াডের পরবর্তী সম্মেলনে কিছু কৌশল অবলম্বন করা উচিত এবং এমন কিছু করা উচিত যা চীনকে নিজেদের শক্তির অপব্যবহার রোধে বাধ্য করবে।”



ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যহত রাখতে, পাশাপাশি চীনের গতি শ্লথ করতে বেমালুম অর্থ উপার্জনের গতি রোধ করতে কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর ব্যাপক পরিসরে চেষ্টা করা উচিত বলে অভিমত দেন এই প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ।



এক্ষেত্রে প্রথমেই কোয়াডভূক্ত দেশগুলো নিজেদের জন্য একটি বিকল্প বাজার তৈরী করতে পারে বলে মনে করেন তিনি। দ্বিতীয়ত, চীনের প্রতিরক্ষা বাজেটকে কৌশলগতভাবে ভাগ করানোর ক্ষেত্রে কোয়াডকে মনযোগী হবার পরামর্শ দেন তিনি। আসন্ন কোয়াড বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন নাগাও। পাশাপাশি চীনকে কোনঠাসা করতে ‘গ্রে জোন’ (না যুদ্ধ-না শান্তি) কৌশল ব্যবহারের উপর কোয়াড জোটের দেশগুলোকে জোর দিতে বলেন এই প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ।



চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিযোগিতায় সম্ভাব্য বিজয়ী সম্পর্কে জানতে চাইলে নাগাও বলেন, “সোজাসাপ্টা সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে রয়েছে। এর তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র চীনের চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মিত্র, কূটনৈতিক মিত্রদের সংখ্যা চীনের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে। তাই আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে।”



দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেন, “যুক্তরাষ্ট্র চীনের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আর্থিক কিংবা সামরিক সর্বক্ষেত্রেই। আমেরিকার সামরিক বাজেটও চীনের চেয়ে অনেক বেশি।”



নিজের যুক্তির স্বপক্ষে তৃতীয় এবং সর্বশেষ কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “চীনের প্রতি মার্কিন কূটনীতির ইতিহাস। রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্র্যাট যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেনো, চীনের প্রতি তাঁদের নীতি একই ছিলো এবং রয়েছে। তাই ধারণা করাই যায় যে, চীনকে ঠেকাতে আমেরিকা ইতোমধ্যে নিজেদের পরিকল্পনা স্থির করে রেখেছে কিংবা তৈরীর পথেই রয়েছে।”



প্রসঙ্গত, আলোচনাকালে করোনার উৎপত্তি নিয়ে চীনের বক্তব্যেও সন্দেহ প্রকাশ করেন এই প্রতিরক্ষা গবেষক ও বিশেষজ্ঞ।