প্রতিবছর ভারতে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানী করে থাকে নেপাল। মোট রপ্তানীর প্রায় ৭৪ শতাংশই ভারতে পাঠায় তাঁরা।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিপর্যস্ত গোটা দক্ষিণ এশিয়া। ২০১৯ এ প্রথমবার সংক্রমণের পর চলতি বছর সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে সংক্রমণের হার। ফলস্বরূপ এক বিশাল বাঁধার সম্মুখীন হয় বিভিন্ন দেশের রপ্তানী এবং আমদানী খাত। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমাদের নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধির জন্য সরবরাহ চেইনের স্থিতিস্থাপকতার গুরুত্ব বেশ ভালোভাবেই টের পাওয়া যাচ্ছে।



২০২০ সালের শুরুর দিকে যখন করোনা ‘মহামারী’ আকারে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন বিশ্বব্যাপী প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসেবে আকাশপথ, স্থল পথ এবং নৌপথ বন্ধ করে দেয় রাষ্ট্রগুলো। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পণ্য পরিবহণ খাত। এক প্রচন্ড ধাক্কা অনুভূত হয় আমদানী এবং রপ্তানীতে।



তবে এক্ষেত্রে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ভারত-নেপাল সীমান্ত এলাকা। সীমান্ত লাইন দেশ দুটোর মধ্যে কোন বিভাজন রেখা অঙ্কনের বদলে, সংযোগের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেশ দুটোর জনগণের জীবনযাত্রাতেও রয়েছে এর সুষ্পষ্ট প্রভাব। বিশ্বের বেশিরভাগ সীমান্তই যেখানে বন্ধ রয়েছে, সেখানে ভারত-নেপাল বাণিজ্য পথ গুলো বিরামহীন সরবরাহের উদাহরণ। সর্বশেষ, ২০২০ সালের এপ্রিলে অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে যেনো ভারত-নেপালের মধ্যকার এই বিশেষ সম্পর্ক আরও বেড়ে গিয়েছে।



নেপালের কাস্টমস অধিদপ্তরের সরবরাহ করা তথ্য অনুসারে, প্রতিবছর ভারতে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানী করে থাকে নেপাল। মোট রপ্তানীর প্রায় ৭৪ শতাংশই ভারতে পাঠায় তাঁরা। তুলনায়, যুক্তরাষ্ট্রে ১০%, জার্মানিতে ৩%, যুক্তরাজ্যে ২%, তুরস্কের ১.৫% এবং জাপানে ১% পণ্য রপ্তানী করে নেপাল। এতেই দেশ দুটোর মধ্যকার বিশেষ সম্পর্কের আচ করা যায়। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যটি অর্জন সম্ভব হয়েছে ২০১৬ সালে করা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে। চুক্তিটির ফলে ভারতের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় নেপাল।



তুলনা করলেই দেখা যায়, করোনা শুরু হবার পর থেকেই বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর মধ্যকার বাণিজ্য যেখানে প্রায় ৫% কমে গিয়েছে, সেখানে নেপাল-ভারতের মধ্যকার বাণিজ্য বেড়েছে প্রায় ২৩.৫%। উল্লেখ্য, নেপাল থেকে ভারতে রপ্তানী করা বেশিরভাগ পণ্যই কৃষি ও খাদ্য দ্রব্য। ফলস্বরূপ, ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান মুক্ত বাণিজ্যে নেপালের কৃষক সম্প্রদায় সরাসরি উপকৃত হচ্ছে। সর্বোপরি, এটি ভারত-নেপালের মধ্যকার বিশেষ সম্পর্কের অনন্য দিক যা মুক্ত বাণিজ্য এবং শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণেই সম্ভব হচ্ছে।



এসবের পাশাপাশি, নেপালে পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে ভারত। দুই দেশের বিনিয়োগে প্রস্তুতকৃত মতিহারি-আমলেখগঞ্জ সীমান্ত সংযোগ এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলস্বরূপ, মহামারীকালীন সময়ে প্রতি মাসে প্রায় ১৪৭ মিলিয়ন রুপী সাশ্রয়ে সক্ষম হয়েছে নেপাল তেল কর্পোরেশন। এমনকি, গত বছর নেপালকে শুধু ডিসেম্বর মাসেই প্রায় ১০০ মিলিয়ন লিটার ডিজেল সরবরাহ করা হয় এই সীমান্ত পথ ব্যবহার করে, যা এক নতুন রেকর্ডও বটে। এছাড়াও, ২০২১ সালের মে মাসে প্রথম দেশ হিসেবে নেপালের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ প্রতিবেশী দেশ গুলোর সঙ্গে ভারতের এনার্জি এক্সচেঞ্জ নীতির আওতায় অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ কেনে।



তবে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মহামারীর দ্বিতীয় তরঙ্গ চলাকালীন সময়েও বাণিজ্য প্রবাহ উন্মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছে ভারত এবং নেপাল। স্বাস্থ্যখাতে ব্যবহৃত প্রচুর চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ওষুধপত্র দিয়ে নেপালকে সাহায্য করেছে ভারত। নেপালের কেন্দ্রীয়, প্রাদেশিক এমনকি জেলা স্তরেও সেবা পৌছে দিতে সক্ষম হয় ভারত। এটি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা সম্পর্কের দারুণ বিকাশেরই উদাহরণ মাত্র।



পরিশেষে, নেপাল-ভারত দুটো দেশই মহামারীতে বিপর্যস্ত। তাই পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকল খাতে উন্নয়নের প্রশ্নে এক হয়ে কাজ করতে হবে দু পক্ষকেই। মুক্ত বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার শকিশালীকরণেই সমৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।



লেখক: নেপালে অবস্থানরত বর্তমান ভারতীয় রাষ্ট্রদূত। (লেখাটি সর্বপ্রথম নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডু ভিত্তিক ‘দৈনিক কান্তিপুরে’ গত ৩১ মে প্রকাশিত হয়েছিলো)