তালেবানরা আফগানিস্তানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলে, পাকিস্তান আফগান ভূখন্ড ব্যবহার করে পুনরায় সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ভারত।

আগামী মাত্র তিন মাসের মধ্যে শেষ হতে চলেছে আফগানিস্তানে মার্কিন অধ্যায়। প্রায় ২০ বছর পূর্বে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান সরকারকে উৎখাত এবং আল কায়েদা দমনের উদ্দেশ্যে আফগান ভূখন্ডে হামলা চালায় মার্কিন সেনাবাহিনী। এরপর থেকে আফগানিস্তানে ঘাঁটি পেতে বসে তাঁরা, যা নিজ ভূখণ্ডের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম সেনা সমাবেশ।



আমরা দেখেছিলাম, ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাদের পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘ আলোচনার পর গত ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারী তালেবানের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে ট্রাম্প প্রশাসন। এতে বলা হয়, একদিকে, মার্কিন সৈন্যরা পরবর্তী ১৪ মাসের মাথায়, অর্থাৎ ২০২১ সালের মে মাসের মাঝে আফগান ভূখন্ড ছেড়ে যাবে। অন্যদিকে, তালেবানরা আমেরিকা এবং তাঁর মিত্র শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের ভূখন্ড ব্যবহৃত হতে দিবেনা।



তবে মে মাসের মধ্যে সৈন্য পুরোপুরি প্রত্যাহার সম্ভব হবেনা বলে ক্ষমতা গ্রহণের শুরু থেকেই ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন। বিগত মার্চ মাসের গোড়ার দিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্টনি ব্লিংকেন একটি শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার প্রস্তাব দেন, যা আফগান প্রশাসনে তালেবানদের শক্তি বৃদ্ধি করবে।



তবে উদ্ভুত এসব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ভারতের সমীকরণ বেশ জটিল পর্যায়ে রয়েছে। যদিও গত ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক সুরক্ষা এবং সামাজিক বিকাশে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করছে ভারত, কিন্তু দেশটির ভবিষ্যত রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে তাঁরা।



বিগত বছর গুলোতে আফগানিস্তানের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভারত ছোট-বড় প্রকল্প মিলিয়ে প্রায় ০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। তবে এরচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আফগানিস্তানের ভবিষ্যতের সঙ্গে ভারতের নিজস্ব সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতার যোগসূত্রও রয়েছে।



ভারত বর্তমানে আফগানিস্তানের আশরাফ গনি সরকারের সমর্থক এবং শুরু থেকেই শান্তি প্রক্রিয়াতে সমর্থন জানিয়ে আসছে। ভারত চায় নারী শিক্ষা, বাল্য বিবাহ বন্ধ এবং সংখ্যালঘু অধিকার সহ নানা প্রশ্নে আফগানিস্তান গত ২০ বছরে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা যেনো ব্যহত না হয়। কিন্তু, তালেবানরা আফগানিস্তানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলে, পাকিস্তান আফগান ভূখন্ড ব্যবহার করে পুনরায় সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ভারত।



আফগানিস্তান প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান সমর্থন জানিয়ে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে, পূর্বে অনেক রোষ থাকলেও, ভারতের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তালেবানরা। তাই, নিজেদের স্বার্থ এবং সুরক্ষা রক্ষায় আফগানিস্তানের জাতীয়, আঞ্চলিক এবং বিশ্বব্যাপী সকল অংশীদারদের সঙ্গে শুরু থেকেই যোগাযোগ রক্ষা করা উচিত ভারতের।



প্রাসঙ্গিকভাবেই তালেবানরা ভারত এবং বিশ্বজুড়ে বৃহৎ পরিসরে গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বীকৃতি অর্জন করতে চাইবে। পাশাপাশি তাঁদের আর্থ-সামাজিক বিকাশের জন্যে তহবিলেরও প্রয়োজন পড়বে। তাই ভারত থেকে যে অনুদান তাঁরা প্রতিবছর পেয়ে থাকে, স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা চাইবে সেই প্রবাহ যেনো অব্যহত থাকে। উল্লেখ্য, আফগানিস্তানের উন্নয়নে ভারত সর্ববৃহৎ বিনিয়োগকারী দেশ।



তবে ভৌগলিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট এমন জটিল পরিস্থিতিতে পাকিস্তান নিঃসন্দেহে বিজয়ীর হাসি হাসছে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে মার্কিন সরকার এবং তালেবান উভয়ের সঙ্গেই যোগাযোগ রক্ষা করে এসেছে দেশটি। তবে এটি নিশ্চিত নয় যে, তালেবান নেতৃত্ব সারা বিশ্বে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরীতে বেশি মনযোগী হবে, নাকি পাকিস্তানের লাঠিতে ভর দিয়ে এগোবে।



এটি মোটামুটি নিশ্চিত যে, মার্কিন সৈন্যরা দেশ ছাড়ার পরপরই আফগানিস্তানের অনেকাংশ তালেবান নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এক্ষেত্রে, তালেবানদের উপর পাকিস্তানের উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকা সত্ত্বেও অদূর ভবিষ্যতে তাঁরা পাক সেনাবাহিনী এবং আইএসআই এর পক্ষে শুধুমাত্র প্রক্সিদূত হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবে বলে মনে হয়না।



তবে, একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ভূখন্ড থেকে পুরোপুরি নিজেদের সৈন্য প্রত্যাহার করলেও, সম্পূর্ণরূপে আফগানিস্তানকে হাতছাড়া করতে না। আফগানিস্তানের পরবর্তী উন্নয়ন কার্যক্রম সহ ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে এখানে কয়েকটি ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী তাঁরা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পাকিস্তান এক্ষেত্রে কিছু সুবিধার বিনিময়ে মার্কিন সৈন্যদের জন্য জায়গা সরবরাহ করতে পারে।



কিন্তু এখানে পাকিস্তান কিছু জটিলতার সম্মুখীন হবে। প্রথমত, তালেবানরা এক্ষেত্রে পাকিস্তানের বিরোধিতা করতে পারে। অন্যদিকে চীন বিষয়টি ভালোভাবে নিবেনা। কারণ এটি মার্কিন বাহিনীকে চীন ভূখন্ডের কাছাকাছি নিয়ে আসবে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেনো চীনের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে আপস না করা হয়।



প্রসঙ্গত, বিগত বিশ বছরে আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতিতে চীন এবং রাশিয়াও যারপরনাই উপকৃত হয়েছে। মার্কিন বাহিনী সরে যাবার পর চীন কিছু বিষয়ে উদ্বীগ্ন হয়ে পড়বে। যেমন, জিনজিয়াং প্রদেশে এবং উইঘুর প্রদেশে মুসলিমদের উপর নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা বিরোধ শুরু করবে আল কায়েদা সহ অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং চীন-আফগান ওয়াখন করিডোরের মাধ্যমে প্রবেশের চেষ্টাও করবে। উদ্ভুত প্রেক্ষাপটে আগত পরিস্থিতি মোকাবেলার নিমিত্তে চীন আফগানিস্তানের সীমান্তে তাজিকিস্তানে একটি সেনা ঘাঁটি স্থাপন করেছে।



আবার, আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদের পুরো সুবিধা নিতে চাইবে চীন। ইতোমধ্যে নতুন বিনিয়োগ এবং পূর্বের বিনিয়োগ চুক্তি গুলোকে জীবন্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে চীন। পাশাপাশি আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপন এবং ওয়ান বেল্ট রোডে আফগানিস্তানকে যুক্ত করার ব্যাপারেও আগ্রহী তাঁরা। এটি নিঃসন্দেহে ভারত এবং আমেরিকার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হবে।



তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৈন্য প্রত্যাহার করায় আফগানিস্তান একটি নতুন সমীকরণের সম্মুখীন হবে। আগামী কয়েক মাসে চীন, পাকিস্তান এবং রাশিয়া সেখানে প্রভাব বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নিবে। তাই নিজ স্বার্থরক্ষা এবং সুরক্ষা নিশ্চিতে ভারত এবং মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তৎপর থাকতে হবে। আগামী কিছুদিনের রাজনীতিতে এক অদৃশ্য দাবার বোর্ড হয়ে উঠবে আফগানিস্তান।



লেখক: সভাপতি, গ্লোবাল স্টাডিজ ইনস্টিটিউট এবং ফেলো, অনন্ত অ্যাস্পেন সেন্টার। তিনি কাজাখস্তান, সুইডেন এবং লাটভিয়ায় দায়িত্ব পালন করা প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত। লেখনীতে প্রকাশিত সম্পূর্ণই তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি।