ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ন্যাটো এবং কোয়াড জোটের সম্প্রসারণে হুমকির মুখে পড়বে বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

চীনের পূর্বদিকে ন্যাটোর অব্যহত সম্প্রসারণ এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কোয়াডের উত্থান চীনকে উদ্বীগ্ন করে তুলেছে। শি জিন পিং এর নেতৃত্বাধীন দেশটি উপরোক্ত দুটো জোটের ক্রমাগত পরিধি বিস্তারকে কেন্দ্র করে রীতিমতো চাপে রয়েছে। কেননা এটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীন কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে উচ্চাভিলাষ চীনা নেতৃত্বের রয়েছে, তাঁর প্রতি বড় ধরণের হুমকি স্বরূপ।

তাছাড়া, ন্যাটো এবং কোয়াড যেভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করছে, এতে হুমকির মুখে পড়বে বৈশ্বিক রাজনীতিতে পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবার চীনা উচ্চাকাঙ্ক্ষা। একদিকে, নতুন পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ন্যাটোতে যোগদানের অপেক্ষায় রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশ। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক এবং সামরিকভাবে প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে কোয়াড, যাকে ইতোমধ্যে এশীয়ার ন্যাটো হিসেবে আখ্যা দিয়েছে চীন। এ দুইয়ের যৌথ সমীকরণ চীনের কৌশল পরিকল্পনাকারীদেরকে নিদ্রাহীন রাত উপহার দেয়ার জন্য যথেষ্ট বলে ধারণা করি।

ইতোমধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় শক্তিধর দেশগুলো থেকে আরম্ভ করে ইউরোপের নীতি-নির্ধারক দেশ গুলো কোয়াডের সঙ্গে নিজেদের একাত্মতা ঘোষণা করেছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও চীনকে টেক্কা দিতে ইতোমধ্যে এর একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থার বিকল্প অনুসন্ধান শুরু করেছে কোয়াড।

তাছাড়া, ন্যাটো জোটের পূর্বমুখী সম্প্রসারণের বিষয়টি রাশিয়ার পাশাপাশি চীনের জন্যেও গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে। মার্কিন সেনাবাহিনীর ক্রমবর্ধমান স্রোত আটকাতে রাশিয়াকে কাছে টানতে চাইবে চীন।

তবে, তুলনামূলকভাবে কোয়াড নিয়েই বেশি উদ্বীগ্ন রয়েছে চীন। এটি দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের প্রভাব ক্ষুন্ন করার পাশাপাশি গোটা অঞ্চলে চীনের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দৃঢ়তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম হয়েছে।

রাশিয়ার সীমান্তবর্তী পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো দক্ষিণ কোরিয়া ন্যাটোতে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করায় এবং দেশটি নিজেদের ভূমিতে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেম মোতায়েন করায়, গোটা বিষয়টিকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে চীন।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, সম্মিলিত সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তির দিক দিয়ে কোয়াড চীনের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে থাকলেও, চীনকে মোকাবেলা করার জন্য এখনও নিজেদের পরিপূর্ণভাবে গুছিয়ে উঠতে পারেনি। এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে কোয়াডের কার্যক্রম।

তারপরও এটিকে এশীয় ন্যাটো হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে চীনা নেতৃত্ব। তথাপি, কোয়াড দেশ গুলো নিজেদের সামরিক সম্পৃক্ততা শুরু থেকেই স্পষ্টভাবে অস্বীকার করছে। কিন্তু গত নভেম্বরে বঙ্গোপসাগরে ‘মালাবর’ নামে কোয়াড দেশ গুলোর সম্মিলিত নৌমহড়া এবং গত মার্চে শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক চীনা পরিকল্পনাকারীদের জন্য ত্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁরা আশঙ্কা করছে যে, এটি চীনের বিরুদ্ধেই অঘোষিত বৃহত্তর সামরিক অংশীদারিত্ব। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে মালাবরকে এখনও কোয়াডের সুরক্ষা বাহিনী হিসেবে কোনো স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।

তবে, এসব সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ন্যাটোর সম্প্রসারণে রাশিয়ার উদ্বেগ। ন্যাটোর পরিধি সম্প্রসারণের বিষয়টি ভারতকে সরাসরি কোনোভাবেই প্রভাবিত করেনা। কিন্তু রাশিয়া ন্যাটোর বাড়ন্ত ভূমিকায় যথেষ্ট উদ্বীগ্ন এবং এর ফলস্বরূপ চীনের সঙ্গে একত্র হয়ে ভারসাম্য বজায় রাখার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে পারে। এদিকে, চীনও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনায় রাশিয়াকে পাশে পেলে খুশিই হবে। রাশিয়া নিজেদের সীমান্তে ন্যাটো সামরিক জোটের দ্বারা সৃষ্ট হুমকি প্রতিরোধে চীনের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব তৈরী করতে চাইবে এবং তা বাস্তব ময়দানে ব্যবহার করবে

এক্ষেত্রে, ভারতের যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ রয়েছে। কেননা রাশিয়া ঐতিহ্যগত ভাবেই ভারতের মিত্র। কিন্তু সম্প্রতি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ কোয়াডকে ব্যাঙ্গ করে বক্তব্য প্রদান করেছেন। তাই কোয়াডে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হবার ক্ষেত্রে ভারতকে অবশ্যই রাশিয়া-চীনের সম্ভাব্য জোট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের উত্থানের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরী করবে।

তবে চীন যেহেতু বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় গণতান্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি, তাই মার্কিন বলয়ে থাকা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহকে এর বিরুদ্ধে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হবে এবং কোয়াডকে অব্যহত সমর্থন জানাতে হবে, যেনো চীন তার সম্প্রসারণবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকে।

লেখক: পররাষ্ট্রনীতিতে দক্ষ সিনিয়র সাংবাদিক। প্রকাশিত লেখনী সম্পূর্ণই তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি।