বৈঠকে সকলের জন্য সুরক্ষা এবং উন্নতি বিধানে প্রধানমন্ত্রী মোদীর দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আইপিওআই উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়

ইতিহাস গড়লেন নরেন্দ্র মোদী। প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করলেন তিনি। ০৯ আগস্ট, সোমবার, ভার্চুয়াল মাধ্যমে আয়োজিত 'আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য সমুদ্র নিরাপত্তা বৃদ্ধি' -শীর্ষক একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন তিনি। বিশ্ব নেতাদের বড় একটি অংশের অংশগ্রহণ এই বৈঠকটিকে করে তুলেছে আরও মহামান্বিত এবং মর্যাদাপূর্ণ।



বৈঠকটির কিছু বিশ্লেষণ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:



বৈঠকটির গুরুত্ব:



এই অধিবেশনটির মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো সমুদ্র সুরক্ষা নিয়ে জাতিসংঘের উচ্চ স্তরে কোনো বৈঠক আয়োজিত হলো। এর আগে ভিয়েতনাম (এপ্রিল ২০২১) এবং নিরক্ষীয় গিনি (ফেব্রুয়ারি ২০১৯) কর্তৃক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেয়া হলেও তা সফলতার মুখ দেখেনি।



ইতোপূর্বে যেটুকু আলোচনা সমুদ্র নিরাপত্তা ইস্যুতে হয়েছিলো, তাঁর সবই সমুদ্রের জলদস্যুতা এবং সমুদ্র অপরাধে সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু ভারত নিজেদের সভাপতিত্বকালে সমুদ্র নিরাপত্তার বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং সফল বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে।



প্রথমবারের মতো 'সমুদ্র নিরাপত্তা' নিয়ে জাতিসংঘের উচ্চ স্তরে আয়োজিত এই সভায় সমুদ্রপথে নিরাপত্তা বৃদ্ধির উপর বাড়তি জোর দেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বের সর্বত্র শান্তিপূর্ণভাবে সামুদ্রিক দ্বন্দ্ব মিটিয়ে নেয়ার জন্যে একটি পাঁচ দফা প্রস্তাবও পেশ করেন তিনি।



উক্ত আলোচনায় ভারত মহাসাগরে অন্যতম অংশীদার হিসেবে ভারতের ভূমিকার পুনরাবৃত্তি করেন মোদী। এসময় ভারতের আহবান করা আইপিওআই উদ্যোগের বিষয়েও আলোচনা করা হয়।



অংশগ্রহণ:



গতকালের অধিবেশনটিতে অংশ নেন মোট ২ টি দেশের রাষ্ট্রপতি, ২ জন প্রধানমন্ত্রী, ১০ জন মন্ত্রী (০৭ জন পররাষ্ট্রমন্ত্রী) । চলতি বছর প্রথমবারের মতো নিরাপত্তা পরিষদের কোনো বৈঠকে এতো বেশি সংখ্যক বিশ্ব নেতৃত্বের অংশ গ্রহণ দেখা যায়। প্রসঙ্গত, নিরাপত্তা পরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা ১৫।



ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এ অধিবেশনে অংশ নেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এর আগে মাত্র দুবার এ ধরণের অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। প্রথমবার ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে এবং সর্বশেষ ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তাঁর অংশগ্রহণ ভারতীয় উদ্যোগে রুশ ঘনিষ্ঠতার একটি স্পষ্ট বার্তা।



তাছাড়া, অধিবেশনে আরও অংশ নেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্টনি ব্লিংকেন। যদিও জাতিসংঘে মার্কিন স্থায়ী প্রতিনিধি ক্যাবিনেট পদমর্যাদার অধিকারী, তথাপি ব্লিংকেনের অংশগ্রহণও রাজনৈতিকভাবে মোদীর আরও একটি সাফল্য।



এছাড়াও, বৈঠকে আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব করেন কঙ্গোর উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফ লুতুনদুলা আপালা পেনআপালা। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ ইভস লা দ্রিন এবং ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেসও অংশ নেন বৈঠকে।



বৈঠকে প্রাপ্ত ফল:



বৈঠকটি আয়োজনের পথ এতো সহজ ছিলো না! এর আগেও কয়েকবার সমুদ্র নিরাপত্তা ইস্যুতে বৈঠক আয়োজনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় বেশ কিছু রাষ্ট্র। ভেটো ক্ষমতার অধিকারী পাঁচটি রাষ্ট্রের সকলকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা এবং আলোচনাটির সফল বাস্তবায়ন নিঃসন্দেহে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা এবং কৃতিত্বের প্রতিফলন। এটি নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের মর্যাদা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।



অধিবেশনের সভাপতি কর্তৃক প্রস্তাবিত রূপরেখাঃ



প্রথম দফায় তিনি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্যের বাঁধা দূর করার আর্জি জানান। তিনি বলেন, “সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদের সমস্ত বাঁধা তুলে দেওয়া উচিত। সমুদ্রপথে কতটা সক্রিয়ভাবে বাণিজ্য হচ্ছে, তার উপর আমাদের সমৃদ্ধি এবং উন্নতি নির্ভরশীল। সেই ক্ষেত্রে কোনও বাধা তৈরি হলে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি ধাক্কা খাবে। অবাধ সামুদ্রিক বাণিজ্য প্রাচীনকাল থেকে ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।”



দ্বিতীয় দফায় মোদী বলেন, সমুদ্র পথের বিরোধ গুলো শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনা ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, “আলোচনা করে, মতৈক্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে জলসীমা সংক্রান্ত বিরোধ মিটিয়ে নিয়েছে ভারত। আলোচনার মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্যের বাঁধা দূর করতে হবে। বিরোধ মেটাতে হবে। তাহলেই আন্তর্জাতিক সমৃদ্ধি আসবে।”



প্রস্তাবের তৃতীয় মূলনীতিতে মোদী আন্তর্জাতিক আইন মোতাবেক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সব দেশের প্রতি আর্জি জানান। তিনি বলেন, “পারস্পরিক ভরসা এবং বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একমাত্র এ পথেই আমরা বিশ্বে শান্তি এবং সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারবো।”



চতুর্থ দফায় মোদী বলেন, সামুদ্রিক পরিবেশ এবং সম্পদকেও সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে, জলদস্যু মোকাবেলা ও সমুদ্র পথের অপব্যবহার রোধের আহবান জানান তিনি। সর্বশেষ পঞ্চম দফায় তিনি প্রস্তাব করেন যেনো সমুদ্র বাণিজ্য বৃদ্ধিকল্পে এবং যোগাযোগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়।