তালেবান নিয়ন্ত্রণাধীন আফগানিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নৃশংসতা যতো বাড়বে, পাকিস্তানের উপর ততো বেশি এর দায় বর্তাবে।

সম্প্রতি মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পরই দেশজুড়ে ক্ষমতা দখলে নেয়ার লড়াই আরম্ভ করে তালেবান। জঙ্গী গোষ্ঠীটিকে প্রত্যক্ষ সমর্থন দেয়ার দরুণ বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে পাকিস্তান। ‘স্যাংশন পাকিস্তান’, ‘স্টপ প্রক্সি ওয়ার’, ‘স্টপ সাপোর্টিং টেরোরিস্ট গ্রুপ’ এর মতো প্রভৃতি হ্যাশট্যাগে সয়লাব হয়ে যায় সোশ্যাল মিডিয়া জগৎ।



এরই সূত্র ধরে গত সপ্তাহে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরীকে সাথে নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেন দেশটির প্রধান নিরাপত্তা উপদেষ্টা মুইদ ইউসুফ। সেখানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে ব্যাপক ট্রেন্ডিং এর জন্যে মূলত ভারত এবং আফগানিস্তানের সরকারী সংস্থাকে দায়ী করে বক্তব্য দেন তিনি।



নিজ বক্তব্যে মুইদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি আফগানিস্তানের আভ্যন্তরীণ যুদ্ধে আমাদেরকে (পাকিস্তানকে) বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। আফগান সরকার নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়াচ্ছে। পাকিস্তানকে বদনাম করতে আফগান ও ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্ট গুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।”



মুইদের বক্তব্যের সুর ধরেই বক্তব্য দেন পাক তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরীও। ব্যাপক পাক বিরোধী ট্রেন্ড ছড়ানোর জন্যে ভারত ও আফগানিস্তানের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।



তবে পাকিস্তান সরকার যাই বলুক না কেনো, তালেবান নিয়ন্ত্রণাধীন আফগানিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নৃশংসতা যতো বাড়বে, পাকিস্তানের উপর ততো বেশি এর দায় বর্তাবে। মানুষ ততো বেশি পাকিস্তানকে দোষারোপ করবে। এটাই প্রকৃত সত্য।



আরেকটি মজার বিষয় হলো, যে টুইট বা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট নিয়ে পাক নীতি-নির্ধারকরা আফগানিস্তান এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে কাঠগড়ায় দাড় করাচ্ছেন, তাঁর প্রায় ২২% তাঁদের নিজ দেশের নাগরিকের করা। এ প্রসঙ্গে পাক কর্তৃপক্ষের দাবি সরকার বিরোধী সংগঠন পশতুন তাহফুজ মুভমেন্ট এসব টুইট করেছে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সর্বোপরি বিষয়টিকে হাস্যরসের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে পাক সরকারের এমন কর্মকান্ড।



পাক তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছেন যেখানে পাক বিরোধী সোশ্যাল মিডিয়া প্রবণতার সার্বিক মূল্যায়ন অন্তর্ভূক্ত ছিলো। সেখানে মূলত ২০১৯-২১ অবধি সময়কালে পাক সরকার বিরোধী পোস্ট গুলোকে বিশ্লেষণ পূর্বক এর জন্যেও ভারতকে দায়ী করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।



পাক সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এবং প্রচার চালাচ্ছে যে, পাকিস্তান বিরোধী ট্রেন্ড ছাড়াও পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বদনাম করা, দেশকে এফএটিএফ গ্রে তালিকায় রাখা এবং আফগানিস্তানে তাঁদের ভূমিকাকে বিতর্কিত করার সম্পূর্ণ দায়ভার ভারতের। ভারতের মদদেই আফগানিস্তানের সরকারি কর্মকর্তাগণও এই চক্রান্তের অংশ হয়ে উঠেছেন বলে তাঁরা গুজব ছড়াচ্ছেন রীতিমতো।



পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সকল বয়ান অনুসারে, ভারতের মদদে আফগান সরকারী কর্তাগণ তালেবান সম্পৃক্ততা এবং সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়া সহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে বয়ান দেন। এর পাশাপাশি আফগানিস্তানে গ্রেপ্তারকৃত পাকিস্তানী নাগরিকদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা এবং আফগান সন্ত্রাসীদের পাকিস্তানে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগও এনেছে তাঁরা আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে।



এসবের প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানের ইমেজের যে ক্ষতি হয়েছে, তা স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানকে বেকায়দায় ফেলেছে। তাই তাঁরা তাঁদের সিনিয়র মন্ত্রীদের নিয়োজিত করেছে এসব প্রসঙ্গে নিয়মিত সাফাই গাইতে।



এর আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কুরেশিও সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড ইস্যুতে নিজ দেশে এক বেসরকারী টিভি চ্যানেলে কথা বলেছেন। তালেবান ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ এড়াতে তিনি পাকিস্তান কর্তৃক আফগান শরণার্থীদের আশ্রয় দান এবং পূর্বের সকল সহায়তার কথা তুলে ধরেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, সোশ্যাল মিডিয়া ঝড়ের পেছনে তিনিও যথারীতি ভারতকেই দায়ী করেন। অথচ তিনি ভুলে গেলেন গোটা বিশ্বজুড়েই এই ট্রেন্ডটি চলছে।



একটু ভ্রুক্ষেপ করলেই আমরা দেখতে পারি, গোটা বিশ্বজুড়েই বর্তমান আফগানিস্তান পরিস্থিতির জন্যে পাকিস্তানকে দায়ী করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং মিত্র দেশগুলো যতোবারই পাকিস্তানকে আফগান সংশ্লিষ্টতা কমানোর চাপ দিয়েছে, ততোই যেনো পাকিস্তান নিজের আফগান মিত্রতা আরও বাড়িয়েছে।



কানাডার প্রাক্তন মন্ত্রী এবং কূটনীতিক ক্রিস আলেকজান্ডার একটি টুইট বার্তায় বলেছেন, “এটি শুধুমাত্র হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং নয়। এটি আফগানিস্তান, পাকিস্তান সহ অন্য অনেক রাষ্ট্রের নাগরিকদের শান্তিতে থাকার দৃঢ় সংকল্পকে প্রতিফলিত করে।”



তিনি আরও বলেন, “আফগানিস্তানে পাকিস্তানের আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ের অধীনে সশস্ত্র আক্রমণ এবং আগ্রাসনের কাজ। আন্তর্জাতিক আইন এবং নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা সমুন্নত রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই অনুচ্ছেদ ৪১ বা ৪২ এর অধীনে পদক্ষেপ নিতে হবে।”



দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিন ফেয়ার এক টুইট বার্তায় বলেছেন, “আপনি যদি আফগানদের বনাম পাকিস্তানের প্রক্সিদের হত্যাকান্ডের দৃশ্য কল্পনা করেন, তাহলে আপনার উচিৎ কিছু করা। স্যাংশন পাকিস্তান।”



সর্বোপরি, তালেবানকে প্রত্যক্ষ মদদের ক্ষেত্রে এমন কোনো ধাপ বাকি নেই যা পাকিস্তান করেনি। তালেবান সন্ত্রাসীদের রসদ সরবরাহ সহ তাঁদের আহত যোদ্ধাদের পাকিস্তানের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেও শোনা গিয়েছে।



সম্প্রতি তালেবানের হাতে বন্দী আফগান যুদ্ধনায়ক ইসমাইল খান তাঁর এক ভাষণে বলেছিলেন, এটি তালেবানের বিরুদ্ধে আফগান সরকারের যুদ্ধ নয়। এটি আফগান জাতির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যুদ্ধ। তাই গোটা পৃথিবীর নিঃসন্দেহে বুঝতে বাকি নেই তালেবানের এই দ্রুত উত্থানের পেছনে কার দায় সবচেয়ে বেশি।



পাকিস্তানের প্রতি অভিযোগ আরও গুরুতর হয়ে উঠে যখন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান স্বয়ং ঘোষণা দেন যে, তালিবানরা সাধারণ বেসামরিক নাগরিক। কোনো সামরিক সংগঠন নয়। এছাড়াও নানান কথা ও আচরণের মধ্য দিয়ে আফগান তালেবানের প্রতি নিজেদের অকুন্ঠ সমর্থনের কথা ব্যক্ত করেন পাক প্রধানমন্ত্রী। এর আগে আমরা দেখেছি, ইমরান খান ওসামা বিন লাদেনকে শহীদ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী কুরেশি লাদেনকে সন্ত্রাসী বলতেই অস্বীকৃতি জানান।



এটি স্পষ্ট যে ইমরান খান আশরাফ ঘানির সরকারকে অপছন্দ করতেন। এর আগে ঘানির সরকার পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কুরেশির বিরুদ্ধে তালেবানের মুখপাত্র হওয়ার অভিযোগও করেছিলেন।



বর্তমান আফগান পরিস্থিতিতে যেখানে পশ্চিমা সকল দেশ নিজেদের দূতাবাস থেকে কর্মী ও নিজ জনগণকে সরিয়ে নিচ্ছে, তখন সবার উচিৎ হবে পাকিস্তানকে আর কোনোভাবেই গুরুত্ব না দেয়া। তবেই এর উপযুক্ত শিক্ষা হবে।



ক্রিস আলেকজান্ডার ঠিকই বলেছেন। তাঁর ভাষায়, “পুতিনের রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করে, তাদেরকে গোটা বিশ্ব ধিক্কার দিয়েছিলো, নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো। পাকিস্তান আফগানিস্তানে যে আগ্রাসন চালাচ্ছে, তারপরও আমরা কীসের অপেক্ষা করছি?”



ধারণা করি, আফগানিস্তানে সহিংসতা এবং প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশটিতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বাড়বে। একই সঙ্গে পাকিস্তানকেও হয়তো এই নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু পাকিস্তান এখন যে পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে তাঁরা পেছন ফিরতে পারবে বলে মনে হয়না। তাই তালেবান সন্ত্রাসীরা যত নিরীহ নাগরিকের উপর অত্যাচার করবে, ততোই পাকিস্তানের উপর ক্ষোভ বাড়বে সাধারণ মানুষের।



যদি পাকিস্তানে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়, তাহলে এর আর্থিক সমস্যা নিঃসন্দেহে বহুগুণে বাড়বে। পাশাপাশি বিশ্বে তাঁরা দেওলিয়া হয়ে যাবে। এবার ভাবতে হবে বিশ্বকেই, পাকিস্তানের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া কী সময়ের দাবি নয়?



লেখক: ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, কৌশলগত কূটনীতি এবং নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। (প্রকাশিত লেখনী সম্পূর্ণই তাঁর নিজস্ব অভিমত)