চীন নিঃসন্দেহে আফগানিস্তানে নিজেদের ভিত্তি শক্ত করতে পাকিস্তানকে ব্যবহার করতে চাইবে।

শুরু থেকেই আফগান ইস্যুতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মতানৈক্য বিদ্যমান। নানা ঘটনায় মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে দুই দেশ। এমতাবস্থায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে এশিয়ার প্রভাবশালী দেশ চীনের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে সম্পূর্ণ নতুন এক আবহাওয়ার সৃষ্টি করবে বলে মনে হচ্ছে।

তালেবান কর্তৃক আফগানিস্তান দখলের পর থেকেই অঞ্চলটি জুড়ে চীনের কর্মকান্ড ব্যপক গতি পেয়েছে। তালেবানের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনেও আগ্রহী বেইজিং। এমন প্রেক্ষাপটে ২০০৮ সালে আফগান সরকারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত মেস আয়নক তামা খনির প্রকল্পটি পুনরায় শুরু করতে আগ্রহী চীন। এতোদিন প্রকল্পটিতে আফগান হামলার ভয়ে কাজ শুরু করা হয়নি। তবে এখন পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি আরম্ভ করতে চাচ্ছে চীন। পাশাপাশি আফগানিস্তানকে বেল্ট রোড উদ্যোগে শামিল করা সহ আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের কাজও আরম্ভ করতে চাচ্ছে তাঁরা।

তালেবানও চীনের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনে আগ্রহী। স্বাভাবিকভাবেই সরকার গঠন পূর্বক দেশ চালাতে হলে অঢেল সম্পদ ও অর্থের প্রয়োজন পড়বে তাদের। করোনা মহামারীতে জর্জরিত বিশ্বে চীন ব্যতীত অন্য কোনো দেশই আফগানিস্তানকে এতো বেশি পরিমাণ আর্থিক সহায়তা করতে পারবেনা। তাছাড়া, যে গুটিকয়েক রাষ্ট্র তালেবানকে স্বীকৃতি দিতে চলেছে, তাঁদের মধ্য চীন অগ্রগণ্য। তাই দুই পক্ষের মধ্যে সম কিংবা অসম মিত্রতা স্থাপিত হলে তেমন অবাক হওয়ার কিছু থাকবেনা।

তবে চীন খুব স্বাভাবিকভাবেই কিছু বিষয়ে তালেবান নেতৃত্বকে নজরদারিতে রাখবে। ধারণা করি, তালেবান যেনো ইটিআইএম (ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী আন্দোলন) -এ মদদ না দেয়, সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখবে বেইজিং। এছাড়াও, আফগানিস্তানে সরাসরি গাঁ নোংরা করার কথা হয়তো চীন ভাববে না।

এক্ষেত্রে, দেশটি নিঃসন্দেহে তাকিয়ে থাকবে নিজের মিত্র রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে। চীন নিঃসন্দেহে আফগানিস্তানে নিজেদের ভিত্তি শক্ত করতে পাকিস্তানকে ব্যবহার করতে চাইবে। তবে আফগানিস্তানে চীনের তালেবান প্রেম পাকিস্তানের জন্য কতোটা সুখকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়!

ঐতিহাসিকভাবেই আফগানিস্তান নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে। উভয় দেশই স্বীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা বিবেচনায় আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছে। তাই স্বভাবতই যখনই আফগানিস্তানে ভারতীয় পছন্দের সরকার আসীন থেকেছে, পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে। মুদ্রার উল্টোপিঠে পাক সরকার ঘনিষ্ঠ নেতৃত্ব যখনই আফগান মসনদে আসীন হয়েছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিদ্রাহীন বিস্তর রাত পাড় করেছে।

তবে দেখার বিষয় এই যে, আফগান কর্তৃপক্ষও সবসময় কারুর অধীনস্ত হয়ে থাকেনি। যার দরুণ আজ থেকে প্রায় সাত দশক পূর্বে ১৯৫০ সালে পাকিস্তানকে পাশ কাঁটিয়ে ভারত ও আফগানিস্তানের মাঝে মিত্রতা সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

একটু তাকালেই আমরা দেখতে পারি, আফগানিস্তানকে কৌশলগত গভীরতার অংশ হিসেবে পাকিস্তান সবসময় দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে লেলিয়ে দেয়া সহ তাঁদের প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে পাকিস্তান আফগানিস্তানের বিস্তর ভূখন্ড ব্যবহার করে সুবিধা আদায় করতে চেয়েছে।

অন্যদিকে, ভারত ঘনিষ্ঠ আফগান সরকারের বিরুদ্ধে সবসময়ই অভিযোগ করে চলেছে পাকিস্তান। প্রায়শই তাঁদের বলতে শুনেছি, আফগানিস্তানে নিযুক্ত ভারতীয় কনস্যুলেট গুলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে মদদ দিচ্ছে। তাঁদের দাবি, টিটিপি (তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান) এবং বেলুচ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অর্থ ও অস্ত্র দেওয়ার লক্ষ্যে আফগান ভূখন্ড ব্যবহার করছে ভারত। এছাড়াও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের র’ এবং আফগানিস্তানের এনডিএস -এর বিরুদ্ধে অভিযোগের ডায়েরী খুলে বসেছিলো তাঁরা।

যখনই আফগানিস্তান সরকার স্বীয় উন্নয়ন এবং বাণিজ্যের স্বার্থে ভারত ঘনিষ্ঠ হয়েছে, তখনই এসব অভিযোগের মেলা খুলে বসেছেন পাকিস্তানী নীতি নির্ধারকেরা। বর্তমান পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশী প্রায়শই ভারত বিরোধী বিষেদাগার করে থাকেন। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় আফগান ভূখন্ডে ভারতীয় কূটনীতিকের সংখ্যা অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও ভারতের বিরুদ্ধে রীতিমতো অপপ্রচারে ব্যস্ত থাকে পাক কর্তৃপক্ষ।

এছাড়াও, পাকিস্তানে হওয়া সকল অপকর্মের দায়ভার যেনো ভারতেরই! এ লক্ষ্যে কুরেশি সহ পাকিস্তানের অন্য নেতাগণ সবসময়ই ভারত বিদ্বেষী মন্তব্য করেই থাকেন। সব প্রশ্নের সহজ উত্তর যেনো ভারত! এমনকি সাম্প্রতিক দাসু হামলার ঘটনায় চীনের নয়জন সহ মোট ১৭ জন নিহত হোন। সেখানেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে দোষ দিতে ছাড়েনি তাঁরা। এই হামলার পেছনেও অনৈতিকভাবে ভারত ও এর গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়।

তবে সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার পাকিস্তানের তালেবান নীতিতে। তাঁরা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে নিজেদের শত্রু হিসেবে আখ্যা দেয়। আবার আফগান তালেবানকে মদদ দিয়ে মসনদে বসার পথ সুগম করে দেয়। আবার তাঁদের সেনা প্রধান জেনারেল বাজওয়া পাক আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে নিজ বক্তব্যে জানান যে দুই তালেবান আদতে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ! অন্যদিকে আবার টিটিপি-কে ভারতের মদদপুষ্ট হিসেবে আখ্যা দেন তাঁরা। অথচ তাঁদের নজরে এও রয়েছে যে, আফগান তালেবানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দহরম মহরম!

এদিকে, আফগান তালেবান দাবি করেছে টিটিপি তাদেরই সাংগঠনিক অংশ। খবর রয়েছে যে, তালেবান কর্তৃক কাবুল দখলের পর বাগরাম এবং কাবুল কারাগারের যেসব রাজবন্দীকে মুক্ত করে তালেবান, তাঁদের মধ্যে পাকিস্তানের মোস্ট ওয়ান্টেড টিটিপি নেতাদের কয়েকজনও ছিলো। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না, আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সকল অভিযোগই অহেতুক, বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন।

যারা আফগানিস্তান সঙ্কট সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা রাখেন, তাঁরা জানেন, সেখানে ভারতীয় সফট পাওয়ার বৃদ্ধির আশঙ্কা করছিলো পাকিস্তান। দেশটি জুড়ে ছড়িয়ে থাকা উন্নয়ন প্রকল্প, চিকিৎসা সহায়তা কেন্দ্র, বিনোদন কেন্দ্র, শিক্ষা বৃত্তি এবং আফগান সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণের মতো বিষয়াদির সঙ্গে যুক্ত ভারত। তাই সাধারণ আফগানরা ভারত এবং ভারতীয়দের ভীষণ সম্মান এবং শ্রদ্ধার চোখে দেখেন।

অন্যদিকে, ডুরাল্ড লাইন বিরোধ সহ তালেবানকে সমর্থন এবং দেশ জুড়ে সন্ত্রাসে মদদ দেয়ার অভিযোগে পাকিস্তানকে বরাবরই অবিশ্বাস এবং ঘৃণার চোখে দেখে আফগান জনসাধারণ। পাকিস্তান বিরোধী যে ট্রেন্ড সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তার নেতৃত্বেও ছিলো সাধারণ আফগান জনগণই।

তালেবান দ্বারা আফগানিস্তান দখলের পর ভারতের চাওয়া অত্যন্ত পরিস্কার। ভারতীয় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অব্যহত রাখার পাশাপাশি আফগান ভূখন্ড ব্যবহার করে কেউ যেনো ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা না চালাতে পারে, তাঁর নিশ্চয়তা বিধান করা। অতীতে অনেকবারই ভারতীয় দূতাবাসে তালেবান সন্ত্রাসী বা তাঁর প্রক্সিদের কাজে লাগিয়ে ভারতীয় দূতাবাস গুলোতে হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। তাই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ভারত চায় না।

তবে এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও মনে রাখতে হবে, আফগানিস্তান কখনোই ডুরাল্ড লাইন মেনে নেয়নি এবং বরাবরই পেশোয়ারকে নিজেদের অংশ বলে মনে করে। শুধু এই ইস্যুতে হলেও কাবুল এবং ইসলামাবাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে পারেনা। এছাড়াও, আফগানিস্তানের সঙ্গে জাতিগত ও সাংস্কৃতিক নানা ইস্যুতে পাকিস্তানের বিরোধ রয়েছে এবং থাকবেই। তাই সেখানে তালেবান ক্ষমতায় আসলেও বিষয় গুলো পরিবর্তন হয়ে যাবেনা।

তবে বিগত কয়েক বছরে তালেবান হয়তো পাকিস্তানকে আশ্বস্ত করেছে যে তাঁরা ক্ষমতায় এলে এসব বিষয়ে মীমাংসার উদ্যোগ নিবে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, তালেবানের প্রথম মেয়াদেও সমস্যা গুলো তাঁরা জিইয়ে রেখেছিলো এবং সমাধান হয়নি।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তান প্রীতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো। তালেবান অনেকাংশেই পাকিস্তানের প্রভাব বলয়ে আবিষ্ট। তবে উন্নয়ন প্রকল্প সমূহ এগিয়ে নিতে হলেও তালেবান ভারতকে অবশ্যই পাশে চাইবে। অসম্পূর্ণ সকল প্রকল্প তাঁরা সম্পন্ন করতে চাইবে। ইতোমধ্যে সে ইঙ্গিতও দিয়েছে তাঁরা।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে তালেবানের অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত কর্তৃক নিজেদের দূতাবাসের সকল কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং আফগান ভূখন্ডে থাকা নিজ নাগরিকদের প্রত্যাহার করে নেয়ার বিষয়টি আলোচনায় নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। আমরা দেখেছি, পাকিস্তান এবং বেইজিং এখনও তাঁদের দূতাবাস খোলা রেখেছে এবং স্বাভাবিকভাবে কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। তাই পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি বেশ ইতিবাচক বলে মনে করছে বোদ্ধামহল।

এক্ষেত্রে, ভারতের তরফে সচেতন ভাবে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারত আশঙ্কা করছিল যে তালেবান আফগানিস্তান দখলে নিলেও পাকিস্তান নিজেদের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ব্যবহার করে তালেবান ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নিয়ে আফগানিস্তানে থাকা ভারতীয় দূতাবাসগুলোতে হামলা চালাবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে। তাই তাঁরা তাঁদের কর্মী প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

তাই সর্বোপরি বলা যায় যে, আফগানিস্তানে চীনের উপস্থিতি পাকিস্তানের জন্য প্রাথমিকভাবে সুবিধা এনে দিবে। তবে পরবর্তীতে কী হবে, তা সময়ই বলে দিবে।

লেখক: ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, কৌশলগত কূটনীতি এবং নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। (প্রকাশিত লেখনী সম্পূর্ণই তাঁর নিজস্ব অভিমত)