অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আফগানিস্তানে চীনের কূটনীতি ফলপ্রসূ হবার সম্ভাবনা কম।

মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর থেকেই পাকিস্তানের গোপন এবং প্রত্যক্ষ সমর্থনে ভূখন্ডটি থেকে আশরাফ ঘানির সরকারকে সরিয়ে পুনরায় ক্ষমতা দখলে নেয়ার লড়াইয়ে মেতে উঠে আফগান তালেবান। অবশেষে প্রায় বিনা বাঁধায় কাবুল দখল এবং সরকার গঠনেও সক্ষমও হয়েছে তাঁরা। ফলস্বরূপ গোটা অঞ্চল জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক খেলার।



বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই আফগানিস্তানে প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে চীন। পাকিস্তানের সঙ্গে ঐতিহ্যগত সু সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে এই প্রচেষ্টায় তাঁরা অনেক এগিয়েও গিয়েছে। বুঝতে অসুবিধা নেই, ইতোমধ্যে বেইজিং এর সমর্থন লাভ করেছে তালেবান। কয়েক সপ্তাহ পূর্বেই দেশটি সফর করেন তালেবান নেতৃত্ব। চীনও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে ৩ কোটি ডলারের জরুরী সহায়তা দেবে বলে ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে।



একই সঙ্গে, আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর সম্প্রসারণের দিকেও নজর দিচ্ছে চীন। সে লক্ষ্যে প্রকল্পটিতে প্রায় ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দও বৃদ্ধি করেছে তাঁরা। আফগানিস্তানের বৃহৎ খনিজ সম্পদ কাজে লাগানোর আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে দেশটির। তবে এখানেই আসলে সব সন্দেহের শুরু!



অর্থনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ করে কোনো দেশের কূটনীতি ও রাজনীতি গ্রাস করা চীনের পুরোনো কৌশল। আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান নেতৃত্ব বিষয়টি খুব ভালো করেই জানে। ইতোমধ্যে তালেবান রাজনীতি অনেকটাই পাকিস্তান নির্ভর হয়ে গিয়েছে। চীনকে টেনে এনে তা আরও কঠিন বেড়াজালে জড়াতে তালেবান নেতৃত্ব কতোটা আগ্রহী হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা মুশকিল!



চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের সুবাদে ইতোমধ্যে পাকিস্তানের উপর ব্যাপক ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান। এর মাধ্যমে পাকিস্তানের কৌশলগত সম্পদের উপর ধীরে ধীরে অধিকার জমাচ্ছে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রটি। ব্যাপক পরিমাণ ঋণের দায় মেটাতে গিয়ে পাকিস্তানের আর্থ-সামাজিক অবস্থান যেমন দুর্বল হয়ে পড়ছে, তেমনই সার্বিক অগ্রগতি ব্যহত হচ্ছে।



চলতি বছর এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায় পাকিস্তানের ঋণের বোঝা প্রায় ৯০ বিলিয়ন পেরিয়েছে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই পাকিস্তান চাইবে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর করার মাধ্যমে ঋণের বোঝা কমাতে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করা। এমতাবস্থায় চীন এখানে কতোটা সুফল বের করতে পারবে, তা সময়ই বাতলে দিবে।



গোটা বিশ্ব জানে, আফগানিস্তান আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত একটি দেশ। ইতোমধ্যে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় থাকা প্রায় দশ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ফ্রীজ করে দিয়েছে বাইডেন সরকার। মার্কিন সরকার কোনোভাবেই চায় না এতো বিশাল পরিমাণ অর্থ তালেবান নেতৃত্বাধীন সরকারের হাতে আসুক। এদিকে আফগানিস্তানে ইতোমধ্যে নগদ অর্থের পরিমাণ শুন্যের কোটায় পৌঁছেছে। ব্যাংক গুলোতেও আর কোনো অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। দেশটির অর্থনীতিবিদরা বারংবার সরকারকে তাগাদা দিয়েও সুফল বের করতে পারছেন না।



এমন নিঃস্ব অবস্থায় চীনা ব্যাংক গুলোও আফগানিস্তানে অদৃশ্য লাভের আশায় কতোটা বিনিয়োগের ঝুঁকি নিবে, সেটিও দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব। ব্যক্তিগতভাবে আমার উপলব্ধি, যতক্ষণ না চীন সরকার আফগানিস্তানে থাকা বৃহৎ খনিজ ভাণ্ডারের নাগাল পাচ্ছে, ততক্ষণ অবধি চীন এতো বড় অঙ্কের অর্থ আফগানিস্তানের নিঃস্ব সরকারের হাতে তুলে দিবে বলে মনে হয়না।



সূত্রমতে, আফগানিস্তানের সারজমিনে প্রায় তিন ট্রিলিয়ন ডলারের মতো খনিজ সম্পদ রয়েছে, যা উত্তোলন করতে পারলে আইফোন এবং ক্ষেপনাস্ত্র প্রযুক্তি তৈরীর মতো পণ্যসমূহের উপাদান অত্যন্ত সহজলভ্য হয়ে উঠবে। বিষয়টি আফগান নেতৃত্ব যেমন জানে, চীন সরকার এবং পাকিস্তান নেতৃত্বও তা খুব ভালোভাবেই বুঝে।



তাই যদি খনিজ আহরণের বিষয়ে আপাদমস্তক ছাড় চীনকে দেয়া হয়, তবেই হয়তো চীন আগ্রহ ভরে আফগানিস্তানের উন্নয়নে কাজ করবে। উল্লেখ না করলেই নয়, ইতোপূর্বে, সোভিয়েত নেতৃত্ব এবং মার্কিনীরা আফগানিস্তানে যথেষ্ট পরিমাণ উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করেছে। যদিও সেখানে তাঁদের স্বার্থ লুকায়িত ছিলো, তথাপি সেসব কর্মকান্ড আদতে আফগান নাগরিকদেরই কাজে এসেছে।



এমতাবস্থায় ভবিতব্য নির্ভর করছে তালেবান নেতৃত্বের চতুরতার উপর। সন্দেহ নেই, তালেবান সরকার নিজেদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে চাইছে। তাই তাঁরা চরম পদক্ষেপ নিতেও পিছপা হতে রাজি নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তালেবান নেতৃত্ব যদি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তবে চীনের কৌশল এখানে ন্যাসাৎ হতে বাধ্য।



তবে সবচেয়ে মজার বিষয়টি হচ্ছে, এখনও অবধি চীন এবং তালেবান সম্পর্কের একটি অপ্রকাশিত দিক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে খুব কম। সেটি হচ্ছে মাদক নিয়ে তাঁদের মধ্যকার অবাধ এবং অবৈধ্য ব্যবসা। বিষয়টি ইতোমধ্যে চীনা কর্তৃপক্ষের কাছেও মাথাব্যথা হয়ে উঠেছে। চীন-আফগান সীমান্তে অবাধে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ড্রাগ ডিলারগণ।



সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে জাতিসংঘও নড়েচড়ে বসেছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) রিপোর্ট অনুযায়ী, আগের বছর গুলোর তুলনায় আফগানিস্তানে গত ২০২০ সালে আফিম এবং পোস্ত চাষ করার জন্যে ভূমির ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। অথচ ২০১২ সালে দেশটিতে প্রায় ৮৫ শতাংশ কম মাদক উৎপাদন করা হতো।



তাই স্পষ্টতই তালেবান আফিম থেকে একটা বড় ধরণের লাভ নেয়ার চেষ্টা করবে। তালেবানের সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে পাকিস্তানও চাইবে এখান থেকে সুবিধা আদায় করতে। কিন্তু এটি মাথাব্যথার কারণ হবে চীনের তরুণ সমাজের জন্যে।



এছাড়াও আরেকটি বিষয় এখানে প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। তা হচ্ছে, উইঘুর অঞ্চলে মুসলিমদের নির্যাতিত হওয়ার বিষয়টি। এখানে সন্ত্রাসবাদ ইস্যু সরাসরি জড়িত। তালেবানরা এখন পায়ের তলার জমি শক্ত করতে চীনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে কী হবে, তা বলা মুশকিল। তাই ভবিষ্যতে যে তালেবান উইঘুর অঞ্চলে মুজাহিদিন সাপ্লাই করবে না, তাঁর নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব নয়। আর সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য ও সার্বিক ভাতৃত্ববোধের অংশ হিসেবে পাকিস্তানও প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে পাশে থাকবে তালেবানের।



তাছাড়া, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আফগানিস্তানে কেউই চিরদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। দেশটির ভৌগলিক অবস্থান এবং সার্বিক জাতীয়তাবোধ চীনের মতো কারুর আনুগত্য কতদিন বয়ে বেড়াবে, সেটিও প্রশ্ন থেকেই যায়!



এক্ষেত্রে, তালেবানরা পাকিস্তানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের পাশাপাশি কিছুটা দায়বদ্ধও। পাকিস্তানের গোয়েন্দা এজেন্সি আইএসআই এর প্রত্যক্ষ মদদে পুনরায় ক্ষমতার মসনদে বসেছে জঙ্গী সংগঠনটি। এমতাবস্থায় আর্থিকভাবে না হলেও ভূ-রাজনৈতিক নানা দিক থেকে তালেবান নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা হাসিল করবে পাকিস্তান। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নেই পাকিস্তানের সমর্থনে আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে সরকার গড়েছে হাক্কানীরা।



তাই যে লাভের আশায় চীন আফগানিস্তান অভিমুখে যাত্রা করেছে, তা কতটা বাস্তবায়িত হবে, সেটির জন্য আমাদের সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে। ইতোপূর্বে চীন যেসব মানদণ্ড বিবেচনায় নিজেদের সাফল্য স্থির করতো, আফগানিস্তানে সে হিসেবও চলবেনা। এখানে সামরিক, ভূ-রাজনৈতিক সহ নানা ধরণের হিসেব নিকেশ জড়িয়ে থাকবে। অতি সূক্ষ্ম দাবার চালে ফল নির্ধারিত হবে।



তাই অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আফগানিস্তানে চীনের কূটনীতি ফলপ্রসূ হবার সম্ভাবনা কম। হয়তো সাময়িক বা প্রাথমিক সাফল্য তাঁরা পাবে, কিন্তু, প্রশ্ন থেকেই যায়, পাকিস্তান-তালেবান জোট চীনের মাথাব্যথা হয়ে উঠবে না তো?



লেখক: কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক; প্রকাশিত লেখনী সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব অভিমত।