চলতি বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কেরও ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে

উপমহাদেশীয় উত্তরসূরি রাষ্ট্র সমূহের মধ্যে শুরু থেকেই বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে যে মিত্রতার সম্পর্ক রয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের জন্য অনুকরণীয় এবং অনেকাংশে ঈর্ষনীয়ও। চলতি বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কেরও ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ভারতের সঙ্গে যে গভীর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলো, সে ধারা দু দেশের বর্তমান সরকারের আমলে আরও বেড়েছে বৈ কমেনি।

দুই প্রতিবেশীর মধুর সম্পর্কের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে গত সপ্তাহটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক নজির হয়ে থাকবে। গত সপ্তাহে ভারত সফরে আসেন বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় উদযাপন উপলক্ষ্যে উভয় রাষ্ট্রই যৌথভাবে মৈত্রী দিবস পালন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের ভারত সফর নিঃসন্দেহে বিশেষ বার্তা বহন করে।

এর আগে আমরা দেখেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে মার্চ মাসে দেশটির সফর করেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। সেবার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছিলো। মোদীর সেই সফরের পর গত সপ্তাহেই প্রথম বাংলাদেশের পক্ষে উচ্চ পর্যায়ের কোনো সফর অনুষ্ঠিত হলো।

গত ০৬ এবং ০৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সফরটি বেশ কিছু কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মাঝে নয়াদিল্লীতে প্রেসক্লাব অব ইন্ডিয়ায় ‘বঙ্গবন্ধু মিডিয়া সেন্টার’ উদ্বোধন অন্যতম। এছাড়াও, ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পররাষ্ট্র সচিব শ্রী হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী অনুরাগ সিং ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি।

এসব সাক্ষাতের সময় দু দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন হাছান মাহমুদ।

এসময় দুই দেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মীয়মাণ বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মভিত্তিক বায়োপিকের অগ্রগতি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর ও ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্ভাব্য যৌথ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা।

আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবং ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে যৌথ উদ্যোগে ‘মৈত্রী দিবস’ উদযাপনের বিষয়েও ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। পাশাপাশি ভ্যাকসিন কূটনীতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মিলিত হোন তাঁরা।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের সেনা প্রধানের সাম্প্রতিক ভারত সফরে বাংলাদেশ এবং ভারতের প্রতিরক্ষা বন্ধন আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দু দেশের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে সার্বিক আলোচনায় মিলিত হোন উভয় রাষ্ট্রের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাগণ।

০৬ থেকে ০৮ সেপ্টেম্বর অবধি সময়কালে ভারত ভ্রমণ করেন জেনারেল শফিউদ্দিন আহমেদ। এর আগে গত এপ্রিল মাসে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে পাঁচদিনের সফর করেন ভারতীয় সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নারাভনে।

তিনদিনের ভারত সফরকালে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিরাপত্তা পরিষদ সচিবালয়ের সামরিক উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল বিনোদ জি খন্দরে, প্রতিরক্ষা সচিব অজয় কুমার; চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল বিপিন রাওয়াত; ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান মনোজ মুকুন্দ নারাভানে এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আরকেএস ভাদৌরিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জেনারেল শফিউদ্দিন আহমেদ।

সেখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ছাড়াও আফগানিস্তান সহ আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে মতবিনিময় করেন তাঁরা। এটিও দু দেশের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তাছাড়া, এবছরই প্রথমবারের মতো ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে কুচকাওয়াজে অংশ নেয় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়াতেও নিয়মিত অংশ নিচ্ছে তাঁরা।

এসবের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যবহারের জন্য এবছরও ভারত প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ বাড়িয়েছে। তাই সর্বোতভাবে দু দেশের মধ্যকার সম্পর্ক দিনকে দিন ঘনিষ্ঠ হচ্ছে বলে ধরে নেয়া যায়।

আর যদি দু দেশের উচ্চ পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক সফর দিনকে দিন এভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে প্রতিবেশী এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ এবং জোরালো হবে বলে চোখ বুজে বলে দেয়া যায়। তাই আমরা চাই দু দেশের মধ্যকার সিনিয়র কর্মকর্তা এবং নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মিত সফর অনুষ্ঠিত হোক। সর্বোপরি কল্যাণ সাধিত হোক দু রাষ্ট্রের সকল জনগণের।