আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে ব্রিকস যেখানে বারবার হোঁচট খাচ্ছে, কোয়াড সেখানে স্বীয় লক্ষ্যে এগিয়ে চলছে পুরোদমে

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আঞ্চলিক জোট কোয়াডের শীর্ষ নেতৃত্বের সম্মেলন। চীনকে মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গঠিত জোটটি ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছে।



এবারই প্রথমবারের মতো জোট শরীকদের সরাসরি উপস্থিতিতে আয়োজিত হচ্ছে সম্মেলন। তবে খবরটি প্রকাশের পরই এই জোট এবং হবু শীর্ষ সম্মেলনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাঁও লিজিয়ান বলেছেন, “তৃতীয় দেশকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আঞ্চলিক জোট গঠন জনপ্রিয় হবে না, আর এর কোনও ভবিষ্যৎ নেই।”



চার দেশের সমন্বয়ে গঠিত জোট নিয়ে বেইজিং আগেই বলেছিলো, স্নায়ুযুদ্ধের আদর্শ নিয়ে গঠিত হয়েছে এটি। তাছাড়া এই জোট আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার ক্ষতি করবে বলেও বিবৃতি দিয়ে জানায় তারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ওয়াশিংটনে কোয়াড সম্মেলন আয়োজনের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রতিক্রিয়া জানায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।



ঝাঁও লিজিয়ান আরও বলেন, “চীন বিশ্বাস করে কোনও আঞ্চলিক জোটের কাঠামো হওয়া উচিত সময়ের প্রেক্ষাপটের আলোকে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতাই এর ভিত্তি হবে। জোর দিয়ে বলতে চাই, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় চীন কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইঞ্জিন নয়, বরং শান্তি রক্ষার মূল শক্তি।”



শান্তির জন্য চীনের শক্তি বৃদ্ধিকে পৃথিবীর জন্য ভালো খবর বলে আখ্যা দেন তিনি।



উপরোক্ত এসব বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে খুব ভালো ভাবে বুঝা যায়, কোয়াড ইস্যুতে নড়েচড়ে বসেছে জিনপিং প্রশাসন। ইতোপূর্বে কোয়াডকে এশিয়ান ন্যাটো হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলো দেশটি। সময়ের পরিক্রমায় নানা কূটনৈতিক ইস্যুতে কোয়াডের সাফল্য দিনকে দিন চীনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠছে।



যদিও ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নিজের বেশ কয়েকটি ভাষণে ইতোমধ্যে আশ্বস্ত করেছেন যে, কোয়াড জোট একটি নেহায়েতই অর্থনৈতিক সহযোগিতাকল্পে গঠিত জোট এবং এর উদ্দেশ্য ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সাম্য ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, কিন্তু কোয়াড নিয়ে চীনের অভিযোগের যেনো কোনো অন্ত নেই!



এমনকি গত সপ্তাহেও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মন্ত্রী পর্যায়ে টু প্লাস টু বৈঠক আয়োজন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জয়শঙ্কর বলেন, “এই জোটকে ন্যাটোর সঙ্গে তুলনার কোনো কারণ নেই। ন্যাটো’র মতো শব্দ গুলো কেবলই আপনাকে পেছনের দিকে টানবে। কোয়াড ভবিষ্যতের অগ্রপথিক। আমরা টেকসই উন্নতি অর্জনে একসঙ্গে কাজ করবো।”



তথাপি থেমে নেই চীন। কোয়াড জোটের বিরুদ্ধে অবলীলায় অপপ্রচার চালাচ্ছে দেশটি। পাশাপাশি কোয়াডে ভারতের অন্তর্ভূক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলছে দেশটি। কিন্তু তাঁরা ভুলে যাচ্ছে কোয়াডে ভারতের অন্তর্ভূক্তি কিংবা দৃষ্টিভঙ্গি কেবলই সামরিক নয়। আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে কোয়াডের গুরুত্বও ভারতকে জোটের সদস্য হতে আগ্রহ জুগিয়েছে। জোটের ভবিষ্যত ভারতকে আকৃষ্ট করেছে।



এটা নিশ্চিত যে আঞ্চলিকভাবে চীনকে টেক্কা দিতে হলে এবং আঞ্চলিক দেশ গুলোকে কোয়াডের পক্ষে আনতে হলে কোয়াডকে অনেক দূর যেতে হবে। সেই সব কাজ করতে হবে যা চীন ইতোমধ্যে করছে এবং অবশ্যই চীনের চেয়ে কম মুনাফায়।



গত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত কোয়াড শীর্ষ নেতাদের ভার্চুয়াল সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদীও এসব কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। তবে সব ছাপিয়ে কোয়াডের মাধ্যমে একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়তে নিজের আশাবাদের কথা ব্যক্ত করেন তিনি।



তবে মজার বিষয়, এসব কথার লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের লড়াইও আরম্ভ করে দিয়েছে চীন। ইতোমধ্যে, বাংলাদেশ যদি কোয়াডে যোগ দেয়, তবে সম্পর্ক নষ্ট হবে বলে ঘোষণা দেয় চীন। পাশাপাশি বাংলাদেশে চলমান চীনা প্রকল্প বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেয় দেশটিতে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত।



তাছাড়া কোয়াডের বিপরীতে চীনের আরও একটি জোট গঠনের পরিকল্পনাও অজানা নয়। কোয়াডকে একটি সামরিক জোট আখ্যা দিয়ে চীন বলছে জোটটির প্রধান লক্ষ্য তাঁরা। তাই সামরিক জোট গঠনেও তৎপরতা চালাচ্ছে চীন।



তবে, সব কথার শেষে এটাই বলা যায়, কোয়াড জোট নিঃসন্দেহে সাফল্যের দিকে এগোচ্ছে। আসন্ন শীর্ষ সম্মেলনে আরও শক্তিশালী হবে জোটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে বাড়বে জোটের কার্যকারিতা এবং উপস্থিতি। তাছাড়া সম্প্রতি গঠিত যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা জোটও ভাবাবে চীনকে। সর্বোপরি চীন এসব বিষয়েই রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে।



এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক তুলনামূলক কম বৈশ্বিক প্রভাবের ব্রিকস ফোরামের দিকে। কোয়াড জোটের নেতৃবৃন্দ একে অন্যের বিভিন্ন ইস্যুতে নিয়মিত সংহতি প্রকাশ করলেও সদ্য শেষ হওয়া ব্রিকস সম্মেলনে আমরা দেখেছি নেতারা বিভিন্ন ইস্যুতে একমত হতে পারেননি।



আফগানিস্তান এবং অন্যান্য ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতেও মতপার্থক্য দেখা গিয়েছে ব্রিকস নেতৃত্বের। একদিকে রাশিয়া ও চীন যেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তালেবান নেতৃত্বাধীন আফগানিস্তানকে সমর্থন দিয়ে গিয়েছে, অন্যদিকে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ব্রাজিলের মতো দেশ গুলো তালেবান নেতৃত্বের সমালোচনা করেছে



সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং অর্থনীতি এগিয়ে নিতে পরিকল্পনা প্রণয়নেও মতপার্থক্য প্রকট হয়ে দেখা যাচ্ছে ব্রিকস নেতৃত্বের। ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা। আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে ব্রিকস যেখানে বারবার হোঁচট খাচ্ছে, কোয়াড সেখানে স্বীয় লক্ষ্যে এগিয়ে চলছে পুরোদমে।



তাছাড়া, ব্রিকস প্ল্যাটফর্মে ভারত ও চীনের বিপরীত মুখী অবস্থান সংগঠনটিকে দূর্বল করে দিচ্ছে। আর রাশিয়া কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকা না নেয়ায় সবকিছুই কেমন যেনো গুলিয়ে যাচ্ছে। এদিকে, দূর্বল হয়ে পড়েছে আশিয়ান নেতৃত্বও। আগের মতো সরব উপস্থিতি নেই আশিয়ান ভূক্ত রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদেরও।



তাই বলা যায় আঞ্চলিক ইস্যুতে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক এবং শক্তিশালী হয়ে উঠছে কোয়াড জোট। কোয়াড জোটের কার্যকারিতা চীনের জন্য যেমন মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়াবে, তেমনই কোয়াড ভূক্ত দেশগুলোর প্রত্যাশা ও দায়িত্বও বাড়িয়ে দিবে বহুগুণ।



তাই করোনা মহামারী চলাকালীন এই কঠিন সময়ে ভবিষ্যত ভূ-রাজনীতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।



লেখক: ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, কৌশলগত কূটনীতি এবং নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। (প্রকাশিত লেখনী সম্পূর্ণই তাঁর নিজস্ব অভিমত)