প্রতিবেদনটি এসেছে যখন পাকিস্তান সমর্থিত হাক্কানি নেটওয়ার্ক আফগানিস্তানে একটি কেন্দ্রস্থল গ্রহণ করেছে, যখন ইসলামাবাদ ভারতে সীমান্তে সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে

সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর হিসেবে পাকিস্তানের পরিচিতি নতুন নয়। পাকিস্তানের প্রশাসনিক গদিতে যখন যে সরকারই বসুক না কেনো, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক, নীতি ও প্রশ্রয় সবসময় একই থেকেছে।

সম্প্রতি আফগানিস্তানের দখল নেয়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তালেবানকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সার্বিক সহযোগিতা করছে পাকিস্তান। প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ সংগঠনটির পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। আবার, গত দশকের শুরুতেই ২০১১ সালের ২ মে মার্কিন নেভির সিল বাহিনী পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে গোপন অভিযান চালিয়ে হত্যা করে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে। এছাড়াও, ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড দাউদ ইব্রাহিম থেকে শুরু করে হাফিজ সাইদের ঠিকানা পাকিস্তান।

এরকমই এক জটিল পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রটির উপর এক গবেষণা চালায় মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস। সংস্থাটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। মার্কিন রিপোর্ট জানাচ্ছে, পাকিস্তানে ঘাঁটি গেঁড়ে রয়েছে অন্তত ১২ টি বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠন। এদের মধ্যে ৫ টি সংগঠনের মূল টার্গেট ভারতে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা। এই পাঁচ সংগঠনের মধ্যে আালাদা করে লস্কর ই তৈয়বা ও জইশ এ মোহাম্মদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

পাকিস্তানকে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল আখ্যা দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, “আফগানিস্তানকে টার্গেট করে রাখা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গুলোর পাশাপাশি ভারতকে টার্গেট করে রাখা গোষ্ঠী ও সংগঠন সমূহকেও নিজ ভূখন্ড ব্যবহার করে কাজ করার অনুমতি দিচ্ছে ইসলামাবাদ।”

মার্কিন কংগ্রেসের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, পাকিস্তানের যে কয়টি জঙ্গি সংগঠন বর্তমানে ঘাঁটি গেঁড়ে রয়েছে, তাদের বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। মূলত, পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায় পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন গুলোকে। এর মধ্যে এক ভাগ আন্তর্জাতিক সংগঠন, এক ভাগের লক্ষ্য আফগানিস্তানমুখী, আরেক ভাগের লক্ষ্য ভারত ও কাশ্মীর মুখী, আর বাকি গুলো ঘরোয়া সংগঠন। এছাড়াও শিয়া বিরোধী জঙ্গি সংগঠন রয়েছে কয়েকটি।

এদিকে, লস্কর -এ- তৈয়বার জন্যও আলাদা করে সতর্কবাণী এসেছে মার্কিন কংগ্রেসের রিপোর্টে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৮০ সালে তৈরি হওয়া এই সংগঠন ২০১০ সালে বিদেশী জঙ্গি সংগঠনের তকমা পায়। সিআরএস-এর রিপোর্ট বলছে, ২০০৮ সালে ভারতে বড়সড় হামলার অভিযোগ রয়েছে লস্করের বিরুদ্ধে। ফলে এই সংগঠন নিয়ে আলাদা করে সতর্কতা নেওয়ার কথা বলছে রিপোর্ট।

লস্কর ছাড়াও মাসুদ আজহারের নেতৃত্বাধীন জইশ এ মোহাম্মদ নিয়েও বড় বার্তা দিয়েছে মার্কিন রিপোর্ট। লস্কর যেভাবে ২০০৮ সালে মুম্বইতে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছিল, সেভাবেই ২০০১ সালে ভারতের সংসদে নারকীয় হত্যা লীলা চালায় জাইশ।

তাছাড়া, পাকিস্তানের বুকে ভারতকে লক্ষ্য করে হিজবুল মুজাহাদিনের মতো সংগঠন তাবড় আকার নিয়েছে ও নিচ্ছে। একই সঙ্গে, আফগানিস্তানের বহু জঙ্গি সংগঠনও পাকিস্তানের জল হাওয়ায় বড় হতে শুরু করেছে।

মার্কিন রিপোর্ট জানাচ্ছে, সেভিয়েতের বিরুদ্ধে লড়াই করা আফগানিস্তানের হুজি সংগঠনের বর্তমানের প্রশ্রয়স্থল পাকিস্তান। এই সংগঠন, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানে কার্যকরী।

এছাড়াও পাকিস্তানের বুকে বহু বছর ধরে আল কায়দা স্বীয় পরিসর বাড়িয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের মধ্যেই, ইসলামিক স্টেট খোরাসান, হাক্কানি নেটওয়ার্ক, জুন্দাল্লাহ, সিপাহ-ই-সাহাবা পাকিস্তান (এসএসপি), বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মির মতো সংগঠন ইমরান প্রশাসনের আওতাতেই বেড়ে উঠছে। এছাড়াও রয়েছে তেহরিকে এ তালিবান পাকিস্তান ও লস্কর এ জাঙ্গভি।

এর আগে ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের কান্ট্রি রিপোর্টস অন টেররিজম -২০১৯ (২০২০ সালের জুন মাসে প্রকাশিত) এ বলা হয়েছিলো, “পাকিস্তান নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে চলেছে। এর মধ্যে ভারত মুখী সন্ত্রাসী সংগঠনও রয়েছে, আবার আফগানিস্তান মুখী সন্ত্রাসী সংগঠনও রয়েছে। এতে পাকিস্তান সরকারের অর্থায়নও রয়েছে।”

সর্বোপরি, পাকিস্তান সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ এখনও অবধি দেশ থেকে জঙ্গি সংগঠন সরাতে কিংবা তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদাসীন রয়েছে বলেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।