শ্রিংলার এই সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে এবং করোনা মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে নতুন গতির সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে শ্রীলঙ্কা গিয়েছেন ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব শ্রী হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। ০২ থেকে ০৫ অক্টোবর অবধি হতে চলা তাঁর এই সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার এবং করোনা মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে নতুন গতির সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে শ্রিংলার এই সফর ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতিরও অন্যতম প্রতিফলন বলে মনে হচ্ছে। এ নিয়েই আজকের লেখনী।



ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি



গত মার্চ মাসেও একটি সেমিনারে বক্তব্য প্রদানকালে পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা বলেন, ভারতের ভাগ্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিবেশীগণ নয়াদিল্লির অন্যতম শক্তি। তাই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির প্রধানতম অঙ্গীকার ‘প্রতিবেশী প্রথম’।



শ্রিংলার বক্তব্যের সূত্র ধরেই তাঁর এবারের শ্রিলঙ্কা সফরকে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করবো। তাঁর সফরটির অন্যতম উদ্দেশ্যে নিঃসন্দেহে দ্বিপাক্ষিক চলমান সকল প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং সম্পর্ক জোরদারে করণীয়। পাশাপাশি করোনা মোকাবেলায় চলমান সহযোগিতা পর্যালোচনার পাশাপাশি তা আরও বৃদ্ধিতে নতুন কোনো পদক্ষেপের ঘোষণা আসতে পারে শ্রিংলার এবারের সফরে।



গত বছর থেকেই উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ আরও গভীর হয়েছে নয়াদিল্লি ও কলম্বোর মধ্যে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার লঙ্কান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। এসব বৈঠকে মূলত দ্বিপাক্ষিক ব্যবসায়িক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ভারতীয় অর্থায়নে শ্রীলঙ্কায় গৃহীত প্রকল্প সমূহের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।



তাছাড়া, বিমসটেক, আইওআরএ এবং জাতিসংঘ সহ বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানে পারস্পরিক ভূমিকা এবং স্বার্থের বিষয়েও আলোচনা করেন তাঁরা। খুব স্বাভাবিকভাবেই এসব প্ল্যাটফর্মে নিকট প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার সমর্থন ভারতের একান্ত কাম্য।



এদিকে, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করছেন ভারতীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও। গত জানুয়ারীতে দেশটিতে সফর করেন তিনি। ইতোপূর্বে জয়শঙ্কর বলেছিলেন, “মহামারীর কারণে ভারত এবং শ্রীলঙ্কা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশী প্রথম নীতির আওতায় দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে আমরা স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা অব্যহত রেখেছি।”



পরবর্তীতে নয়াদিল্লীর ভ্যাকসিন মৈত্রীর অংশ হিসেবে প্রায় পাঁচ লক্ষ কোভিশিল্ড ভ্যাকসিন পাঠানো হয় দ্বীপ দেশটিতে। পাশাপাশি এখনও নিয়মিত বিরতিতে মেডিকেল অক্সিজেন পাঠানো হচ্ছে সেখানে।



গত মে মাসেও কলম্বোর উপকূলে এমভি এক্সপ্রেস পার্লে আগুন লাগার পর তার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং গোটা অঞ্চলকে দূষণ মুক্ত করতে ভারতের ভূমিকা অনবদ্য। এছাড়া, লঙ্কার সৌরশক্তি প্রকল্প খাতে ভারত ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার লাইন অব ক্রেডিট বাড়িয়েছে।



সুতরাং, এসব দৃষ্টান্ত থেকে বলাই যায়, দ্বীপ দেশটিতে শ্রিংলার এবারের সফরটিও ভারতের প্রতিবেশী প্রথম নীতিরই প্রতিফলন মাত্র।



পররাষ্ট্র সচিবের সফর থেকে ভারতের প্রত্যাশা:



ইতোমধ্যে জানা গিয়েছে, নিজ সফরে লঙ্কান রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজাপাক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন শ্রিংলা। তাছাড়া, লঙ্কান প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাক্ষে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জি এল পেইরিস এবং অর্থমন্ত্রী বাসিল রাজাপাক্ষের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন তিনি।



দেশটিতে অবস্থানকালে শ্রিংলা ক্যান্ডি, ত্রিনকোমালি এবং জাফনা এলাকায়ও পরিদর্শন করবে বলে সূত্রের খবর। এসময় ভারতের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার উল্লেখযোগ্য দ্বিপাক্ষিক প্রকল্প সমূহ পর্যবেক্ষণ করবেন তিনি। চলমান কিছু প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, গলে ওয়ালহান্দুয়া এস্টেট নির্মাণ, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ৫০,০০০ ঘর নির্মাণ এবং এস্টেট শ্রমিকদের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ। এসব প্রকল্পে ভারত প্রায় ২৭০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়ে রেখেছে।



এছাড়াও, জাফনা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের চলমান নির্মাণকাজ পরিদর্শন করবেন শ্রিংলা। এই কেন্দ্রটি ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লঙ্কান জনগণকে উপহার স্বরূপ প্রদান করেন।



তাই সব মিলিয়ে শ্রিংলার এবারের সফরটি বেশ অর্থবহ। এই সফরটি হয়তো অদূর ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক স্তরে শীর্ষ সম্মেলনের পথ আরও সুগম করবে। রাজনৈতিক ভাবেও শ্রিংলার সফরটি দু দেশের মধ্যকার কিছু অস্থিরতা দূরীকরণের নিয়ামক হতে পারে। পাশাপাশি বাণিজ্য ক্ষেত্রে যদি নতুন কিছুর সঞ্চার ও সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়, তবে তা হবে সোনায় সোহাগা।