শ্রীলঙ্কায় নিজ উপস্থিতি বাড়াতে চায় বেইজিং, কিন্তু শ্রিংলার সাম্প্রতিক সফর ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে বিদ্যমান যাবতীয় দূরত্ব নিরসনে মূখ্য ভূমিকা রাখবে।

ভূ-রাজনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানাবিধ হিসেব বিবেচনায় ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে যেকোনো উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বরাবরই ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে। দু দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এবং নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের ক্ষেত্র বিবেচনায় উভয়ের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তাই নিতান্তই কাম্য। আর এজন্যেই ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব শ্রী হর্ষবর্ধন শ্রিংলার এবারের শ্রীলঙ্কা সফরের গুরুত্ব এতো বেশি।

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র সচিব অ্যাডমিরাল প্রফেসর জয়নাথ কলম্বজের আমন্ত্রণে চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে দ্বীপ রাষ্ট্র সফরে যান ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব শ্রী হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। ০২ থেকে ০৫ অক্টোবর অবধি চলা তাঁর এই সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার এবং করোনা মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সফরকালে লঙ্কান রাষ্ট্রপতি ছাড়াও দেশটির প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এর পাশাপাশি শ্রীলঙ্কায় অবস্থানকালে ক্যান্ডি, ত্রিনকোমালি এবং জাফনা অঞ্চলে ভারতীয় অর্থায়নে চলমান নানান প্রকল্পের পরিদর্শন করেন শ্রিংলা। চলমান কিছু প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, গলে ওয়ালহান্দুয়া এস্টেট নির্মাণ, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ৫০,০০০ ঘর নির্মাণ এবং এস্টেট শ্রমিকদের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ। এসব প্রকল্পে ভারত প্রায় ২৭০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়ে রেখেছে।

বিশেষ করে তামিল অধ্যুষিত জাফনা শহরে শ্রিংলার সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এছাড়া, বৌদ্ধ মন্দিরে পূজা অর্পণের মাধ্যমে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন শ্রিংলা। পাশাপাশি এর মাধ্যমে দু দেশের জনগণের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্কের গুরুত্বও তুলে ধরতে পেরেছেন তিনি। আর সর্বোপরি, ভারতের প্রতিবেশী প্রথম নীতির প্রতিফলন এবারের শ্রিংলার সফরে বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করা গিয়েছে।

বর্তমানে সবাই জানে যে, শ্রীলঙ্কায় নিজ উপস্থিতি বাড়াতে চায় বেইজিং, কিন্তু শ্রিংলার সাম্প্রতিক সফর ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে বিদ্যমান যাবতীয় দূরত্ব নিরসনে মূখ্য ভূমিকা রাখবে।

এবারের সফরে শ্রিংলা লঙ্কান প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাক্ষের সঙ্গে বেশ দীর্ঘ সময় মতবিনিময় করেন। দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে যুদ্ধকালীন সময়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মাহিন্দা রাজাপাক্ষে। সেসময় থেকেই শ্রিংলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে তাঁর। তৎকালীন সময়ে ভারতীয় পররাষ্ট্র দপ্তরের যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন শ্রিংলা।

এর পাশাপাশি লঙ্কান রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজাপাক্ষের সঙ্গেও দীর্ঘ বৈঠক করেন শ্রিংলা। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও অংশীদারিত্ব জোরদারের নানা ইস্যুতে মতবিনিময় করেন তাঁরা। এখানে আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনৈতিক এবং বহুপাক্ষিক নানা বিষয়ই প্রাধান্য পেয়েছে বলে ধারণা করা যায়। তাছাড়া, সম্প্রতি হওয়া লঙ্কান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের বিষয়েও পর্যালোচনা করেন তাঁরা।

একই সঙ্গে, রাজাপাক্ষে ভাইদের অন্যতম, দেশটির অর্থমন্ত্রী বাসিল রাজাপাক্ষের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন শ্রিংলা। এসব বৈঠকের ফলে লঙ্কান নীতি-নির্ধারকদের ব্যাক্তিগত অভিমত ও রাষ্ট্রীয় নীতি সম্পর্কে খুব কাছ থেকে জানার সুযোগ পেয়েছেন শ্রিংলা। তাই ভারতের কাছে লঙ্কান সরকারের চাওয়া কিংবা ভারত সরকার কী যেসব বিষয়ে শ্রীলঙ্কাকে পাশে চায়, সব বিষয়েই বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ ও সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায়না।

প্রসঙ্গত, ভারতের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে শ্রীলঙ্কার। ভারতের প্রতিবেশী প্রথম নীতির অন্যতম প্রধান মিত্র দ্বীপ রাষ্ট্রটি। ভারতের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ও অর্থায়নে দেশটিতে ব্যাপক উন্নয়ন প্রকল্প বিদ্যমান রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, লঙ্কা জুড়ে আবাসন প্রকল্প; রেললাইন আপগ্রেড এবং ট্র্যাক-লেইং; কেকেএস বন্দরের পুনর্বাসন; ডিকোয়ায় মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতাল; জাফনায় বিমানবন্দর পুনর্গঠন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ; মান্নারে তিরুকেতেশ্বরম মন্দির পুনরুদ্ধার; জরুরী অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু সহ প্রভৃতি।

গত মে মাসেও কলম্বোর উপকূলে এমভি এক্সপ্রেস পার্লে আগুন লাগার পর তার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং গোটা অঞ্চলকে দূষণ মুক্ত করতে ভারতের ভূমিকা অনবদ্য। এছাড়া, লঙ্কার সৌরশক্তি প্রকল্প খাতে ভারত ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার লাইন অব ক্রেডিট বাড়িয়েছে।

তাই ভারত সরকার সর্বাবস্থায় সাধ্যমতো শ্রীলঙ্কার পাশে রয়েছে, শ্রিংলার মাধ্যমে কলম্বোর নিকট এই বার্তাই হয়তো পাঠিয়েছে তাঁরা। তাছাড়া, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে মেলবন্ধনের ফলে গোটা অঞ্চলের যে সমৃদ্ধি রয়েছে, তার ফায়দা তৃতীয় কোনো পক্ষ যেনো না নিতে পারে, সেটাই নিশ্চিত হয়েছে শ্রিংলার সঙ্গে শ্রীলঙ্কার শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক সমূহে।

শ্রিংলার এই সফরে আর্থিক ও রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সকল ইস্যুর পাশাপাশি নিরাপত্তা ইস্যুও যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। ভারত মহাসাগরে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে শ্রীলঙ্কাকে পাশে চায় নয়াদিল্লী। পাশাপাশি তামিল রাজ্যে শান্তি নিশ্চায়নেও কলম্বোর ভূমিকা রয়েছে। আবার শ্রীলঙ্কাতেও শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় ভারতের ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য।

এই সফর চলাকালেই দু দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে শুরু হয়েছে অপারেশন মিত্রশক্তি। যৌথ এই সামরিক মহড়াটির অষ্টম সংস্করণ চলছে এবার। প্রায় ১২০ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধি দল শ্রীলঙ্কা গিয়েছে মহড়ায় অংশ নিতে। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতির মাধ্যমে জানানো হয়েছে, মহড়াটির ফলে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক আরও জোরদার এবং ঘনিষ্ঠ হবে। মহড়াটিতে মূলত আন্তঃ ক্রিয়াশীলতা বৃদ্ধি করা এবং বিদ্রোহ ও সন্ত্রাস দমন অভিযানে করণীয় বিষয়াদির উপর অনুশীলন করানো হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কাউন্টার ইনসার্জেন্সি এবং কাউন্টার টেরোরিজম পরিবেশে সাব ইউনিট স্তরে কৌশলগত অপারেশন করার পদ্ধতি শেখানো হবে মহড়ায়।

তাই সব মিলিয়ে শ্রিংলার এবারের সফরটি বেশ অর্থবহ। তাঁর এই সাম্প্রতিক সফর যে দু দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন গতির সঞ্চার করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই সফরটি হয়তো অদূর ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক স্তরে শীর্ষ সম্মেলনের পথ আরও সুগম করবে। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্রে যদি আলোচনার সঠিক বাস্তবায়ন ঘটাতে পারে দুই দেশ, তবে সেটি দু দেশের জনগণের জন্যেই সোনায় সোহাগা।

লেখক: নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক। (প্রকাশিত লেখনী সম্পূর্ণই তাঁর নিজস্ব মতামত)