অন্ততপক্ষে বিগত এক যুগ সময় ধরে ভারতের বিরুদ্ধে দুই ফ্রন্টে একত্রে যুদ্ধ পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে চীন ও পাকিস্তান

গত ১০ অক্টোবর হঠাৎ করেই ভেস্তে যায় ভারত ও চীনের সেনাবাহিনীর কমান্ডার পর্যায়ের ১৩ তম বৈঠক। কোনো অগ্রগতি ও ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয় বৈঠকটি। সীমান্তে শান্তি স্থাপন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজিত আলোচনাটি এভাবে মাঝপর্যায়ে এসে ভেস্তে যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে ভারত ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে।

পূর্ব লাদাখ সীমান্তে দু দেশের পূর্ব ঘোষিত সেনা প্রত্যাহার এবং নতুন করে সেনা সমাবেশ না করার সিদ্ধান্তে কার্যত আঘাত দিলো দু পক্ষের সেনা কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকটি ফলপ্রসূ না হওয়ায়। নিঃসন্দেহে এর ফলে যেকোনো সময় অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে সীমান্ত এলাকা। এমনকি সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে চীনের দ্বিমত কার্যত গোটা অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি উসকে দিয়েছে।

এর আগে, ১৯৯৩ সালে সীমান্তে ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ স্থাপনে সম্মত হয়েছিলো ভারত ও চীন। সে উদ্দেশ্যে একটি চুক্তিও করেছিলো দু পক্ষ। পরবর্তীতে উভয় সেনাবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়া গড়ে তোলার নিমিত্তে ১৯৯৬ সালে আরও একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে দু পক্ষ।

এরই ধারাবাহিকতায়, সীমান্তে শান্তি স্থাপন জোরদার করতে এবং উভয় সেনাবাহিনীর মধ্যে যেকোনো ধরণের সঙ্ঘাত এড়াতে ২০০৫ এবং ২০১৩ সালে আরও দুটো চুক্তি স্বাক্ষর করে দু পক্ষ। এসব চুক্তির মূল উদ্দেশ্যই ছিলো ভারত-চীন সীমান্তে যেকোনো ধরণের বিরোধ মিটিয়ে ফেলা।

কিন্তু এসব চুক্তির আদতে কোনোটাই কোনো কাজে আসেনি, কেননা চীন বরাবরই শান্তি স্থাপন প্রক্রিয়ায় দ্বৈত নীতি অবলম্বন করে এসেছে। দেশটি একদিকে শান্তির কথা বলে আসছে, অন্যদিকে তিব্বতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ও সম্প্রতি ভারতের জিনজিয়াং অঞ্চলে আধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত সেনা মোতায়েন আরম্ভ করে। এমনকি সীমান্ত এলাকাজুড়ে আধুনিক সামরিক অবকাঠামো তৈরী প্রকল্পও হাতে নেয় দেশটি।

তাছাড়া, অন্ততপক্ষে বিগত এক যুগ সময় ধরে ভারতের বিরুদ্ধে দুই ফ্রন্টে একত্রে যুদ্ধ পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে চীন ও পাকিস্তান। আর এজন্যেই মন্ত্রী পর্যায়ে, প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তা ও নীতি নির্ধারক পর্যায়ে এবং সবশেষ স্থানীয় সামরিক নেতৃত্ব পর্যায়ে বৈঠকের পর বৈঠক করেও শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো চূড়ান্ত সমাধান পায়নি ভারত। যদিও এখনো অবধি সীমান্তে কিছু এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে দু পক্ষ, কিন্তু সেটা কতদিন স্থায়ী হবে, তা সময়ই বলে দিবে!

গত বছর ১১ সেপ্টেম্বর মস্কোতে ভারত ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে শান্তি স্থাপন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পাঁচ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো। সে চুক্তিতে সীমান্তে সৈন্য প্রত্যাহার, নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থান এবং সার্বিক অবস্থায় যুদ্ধ পরিস্থিতি ও উত্তেজনা প্রশমনের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিলো।

এরপর চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারী, ১৪ জুলাই এবং ১৭ সেপ্টেম্বরে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের মাধ্যমে শান্তি স্থাপন আলোচনা অব্যহত ছিলো। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও অব্যহত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত ও চীন। সামরিক পর্যায়েও তা শুরু হয়েছিলো চলতি বছর। মূলত ভারতের উদ্যোগেই এসব আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত দশ বছরে প্রায় ২২ বার আলোচনার টেবিলে বসেছে দু পক্ষ। কিন্তু বরাবরই চীনের অসহযোগিতার কারণে ভেস্তে যায় শান্তি আলোচনা।

সর্বশেষ ১৩ তম কর্পস কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনায় চীনের প্রতিনিধি দল সমস্যার সমাধানে কোনো গঠনমূলক পরামর্শ তো দেয়নি, উপরন্তু ভারত কর্তৃক প্রস্তাবিত গঠনমূলক সকল পয়েন্টের বিরোধীতা করেছে বলে অভিযোগ তুলেছে ভারত।

ইতোপূর্বে, পূর্ব লাদাখ অঞ্চলের প্রায় ছয়টি ফ্ল্যাশ পয়েন্টের মধ্যে প্যানগং লেকের গোগরা, গালওয়ান, উত্তর এবং দক্ষিণ তীরের সীমান্ত সমস্যার বিষয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিলো। কিন্তু ডেপসাং এবং হট স্প্রিংসের মতো ফ্ল্যাশপয়েন্ট অঞ্চলের বিষয়ে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় চীনের স্বদিচ্ছা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন উঠছে।

গত সাত দশকে প্রায়শই ভারতের সীমানা লঙ্ঘন করে অনুপ্রবেশ করেছে চীনের সেনাবাহিনী। পরবর্তীতে আলোচনার সুর তুলে সেসব অপরাধকে বৈধতার চাদর পড়িয়েছেন তাঁরা। আমরা সবসময়ই দেখেছি, যেকোনো দেশে সামরিক অভিযান পরিচালনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপের সমালোচনা করে চীন। তাহলে ভারতের বেলায় তাঁদের এই নীতিকথার বরখেলাপ কেনো?

অস্বীকার করার উপায় নেই, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্ক এবং পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা এই ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ভারতকে চাপে রাখতে এবং অদম্য উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ব্যহত করতে সদা হুমকির আশ্রয় নেয় দেশ দুটো। আর তাই এবারের কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনা ভেস্তে যাবার পেছনেও এসব ষড়যন্ত্রের কথাই মনে উস্কানী দিচ্ছে।

তবে বর্তমান ভারত অতীতের তুলনায় অনেক বেশি সাহসী। বর্তমান মোদী সরকার সীমান্তে চীনের অন্যায় সহ্য করার বদলে মোক্ষম জবাব দিচ্ছে। ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি, ফ্রন্টে জওয়ানদের মনোবল বাড়াতে নিজে উপস্থিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী সহ অন্য নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও, সামরিকভাবে চীনের জবাব দিতে অবকাঠামোগত উন্নয়নে মনযোগ দিয়েছে সরকার।

পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে আধুনিক করার কাজেও মনোনিবেশ করেছে তাঁরা। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কিছুদিন পূর্বেই ঘোষণা দিয়েছেন, জীবন দিয়ে হলেও মাতৃভূমির শেষ ইঞ্চি পর্যন্ত রক্ষা করবেন।

তাই আলোচনায় চীনের অনীহা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ক্রমাগত অসহযোগিতা গোটা পরিস্থিতিকে আরও একটি চীন-ভারত যুদ্ধের দিকে ধাবিত করছে কী না, তা ভাবার সময় এসে গিয়েছে।

লেখক: প্রফেসর, চীনা অধ্যয়ন বিভাগ, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (প্রকাশিত লেখনী সম্পুর্ণ তাঁর নিজস্ব মতামত)