সামাজিক-সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক খাতে প্রগতিশীল ভারতের ভাবমূর্তি তুলে ধরার প্রয়াসেই পালিত হচ্ছে আজাদি কা অমৃত মহোৎসব

স্বাধীনতার ৭৫ বছর উপলক্ষ্যে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ পালন করছে ভারত। দেশব্যাপী প্রায় ৭৫ সপ্তাহ ধরে এই অনুষ্ঠান উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো ভারত সরকার। মূলত, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক খাতে প্রগতিশীল ভারতের ভাবমূর্তি তুলে ধরার প্রয়াসেই পালিত হচ্ছে এই অনুষ্ঠানটি। ফলত, ভারতের আসন্ন স্বাধীনতা দিবস ২০২৩ -কে ঘিরে জনসাধারণের মধ্যে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে, তা অভূতপূর্ব।

এই মহোৎসবের ফলে একদিকে যেমন স্বাধীনতার নয়া ইতিহাস জানতে পারছে সাধারন ভারতবাসী, অন্যদিকে এক নতুন আগামীর বার্তাও ছড়িয়ে পড়ছে। শক্তি, সামর্থ্য এবং সম্ভাবনায় যে ভারত পৃথিবীর সবাইকে টেক্কা দিতে পারে, সেই ভারত তৈরীর লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান এই ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্বপ্নের আত্মনির্ভর ভারত গড়ার মঞ্চ এই ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’। সর্বোপরি, নানা বর্ণ, গোত্র, ধর্ম নির্বিশেষে গোটা জাতির এক হওয়ার উপলক্ষ্য এই ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’।

গোটা দেশের পাশাপাশি সমগ্র বিশ্বেও ভারতীয় মিশনসমূহের উদ্যোগে পালিত হচ্ছে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’। গত বছরের ১২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী মোদী কর্তৃক এই উৎসবের ঘোষণার পরপরই বিশ্বের সব ভারতীয় মিশনগুলোতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, অনুদান, বক্তৃতা, প্রচারমূলক ইভেন্ট, কর্মশালা, সমাবেশে, উন্নয়ন কর্মকান্ড, সক্ষমতা বৃদ্ধি কোর্স সহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু হয় এবং এখনও অব্যহত রয়েছে। সেখানে প্রবাসী ভারতীয়রাও অংশ নিয়েছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আজকের লিখাটিও এই সম্পর্কিত! এক নজরে দেখে নিই বিদেশে ভারতের ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ পালনের আদ্যোপান্ত।

কল্যাণমূলক কার্যক্রম:

গত ২২ জানুয়ারী, শনিবার, মালদ্বীপে ভারতীয় হাইকমিশনের একটি টুইটে বলা হয়, প্রজাতন্ত্র দিবস এবং আজাদি কা অমৃত মহোৎসব উদযাপনের অংশ হিসাবে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করেছে তাঁরা। মালদ্বীপের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আহমেদ নাসিম এবং মালদ্বীপে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মুনু মাহাওয়ার এর উপস্থিতিতে রক্তদান শিবিরের উদ্বোধন করা হয়। প্রবাসী ভারতীয় এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা উত্সাহের সাথে এই আয়োজনে অংশ নিয়েছেন।

একইভাবে গত মার্চে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ উদযাপন শুরু করে তানজানিয়ায় ভারতীয় হাইকমিশন। ১৭-২০ মার্চ অবধি সময়কালে তানজানিয়ার ডাক্তারদের জন্য মুহিম্বিলি ন্যাশনাল হাসপাতাল এবং দার এস সালামের আগা খান হাসপাতালে কর্মশালার আয়োজন করা হয় ভারতীয় মিশনের উদ্যোগে। এয়ারওয়ে ম্যানেজমেন্টের অধীনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কর্মশালাটি পরিচালনা করেছিলেন অ্যানেস্থেসিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর জ্যোৎস্না পুঞ্জ এবং ডাঃ রবিন্দর কুমার পান্ডে।

এভাবে বিশ্বের সর্বত্র সকল ভারতীয় মিশনে যথেষ্ট সম্মান ও নিষ্ঠার সাথে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ উদযাপন করা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতেও নানা আয়োজনে অনুষ্ঠানটির সুষ্ঠু সমাধা করা হয়।



বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের অবদান তুলে ধরা:

‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ উপলক্ষ্যে বিদেশের সকল ভারতীয় মিশনে কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি মহাকাশ, স্বাস্থ্য, উদ্ভাবন এবং অন্বেষণের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে গত ৭৫ বছরে ভারতের অবদান ও অর্জন বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার চেষ্টা চালানো হয়।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভাস্থ ভারতের স্থায়ী মিশনে গত এপ্রিলে ‘স্পেস প্রোগ্রাম অফ ইন্ডিয়া@৭৫’ শিরোনামে একটি ভার্চুয়াল ইভেন্টের আয়োজন করা হয়। সেখানে মহাকাশ খাতে স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের যাবতীয় অর্জন ও অবদান তুলে ধরার প্রয়াস চালানো হয়।

এই ইভেন্টের মূল বক্তব্য প্রদান করেন ভারতের ইসরো’র চেয়ারম্যান কে সিভান। সেখানে ভারতের ভবিষ্যত পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য সম্ভাবনার বিষয়েও আলোকপাত করেন তিনি।

এছাড়া, গত জুলাইয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয় হাইকমিশন এবং ইন্ডিয়ান স্কুল অফ বিজনেস ভারতের স্বাধীনতার বিগত ৭৫ বছরে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতে ভারতের অবদান প্রদর্শনে ক্যানবেরায় একটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ -এর অংশ হিসেবে গত ১৪ ডিসেম্বর টোগোতে ভারত ইলেকট্রনিক্স এবং সফ্টওয়্যার এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের সাথে আইসিটি সেক্টরে অংশীদারিত্বের লক্ষ্যে ভারতীয় এবং টোগোলিজ শিল্পের মধ্যে একটি ভার্চুয়াল ব্যবসায়িক বৈঠক করেছে। সেখানে সফটওয়্যার পরিষেবা শিল্প খাতে সহযোগিতামূলক সুযোগ ও সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।

এছাড়াও, বিভিন্ন দেশে ভারতীয় অবদান ও অর্জনের কথা ফলাও করে প্রচার করেছে ভারতীয় মিশনগুলো।


প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রচার:

‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ চলাকালেই বিশ্বব্যাপী ভারতীয় মিশনগুলোর উদ্যোগে ব্যাপক প্রচার হয়েছে ভারতীয় রন্ধনশৈলী, খাদি, যোগ এবং আয়ুর্বেদের মতো ঐতিহ্যবাহী খাতের। ফিটনেস এবং সুস্থতা বজায় রাখতে এসবের ব্যাপক গুণাগুণ নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়েছে বিশ্বজুড়ে।

গত ২৯ এবং ৩০ জুলাই খাদির দু দিন ব্যাপী প্রদর্শনী আয়োজন করে উগান্ডাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন। গত ০৬ আগস্ট ভারতীয় রান্নার প্রতিযোগিতা আয়োজন করে তুর্কমেনিস্তানের ভারতীয় দূতাবাস। যোগ এবং আয়ুর্বেদের গুরুত্ব নিয়ে মারাকায় এক সমাবেশ করেন ভেনেজুয়েলায় ভারতের রাষ্ট্রদূত অভিষেক সিং।

সর্বোপরি, প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের বিষয়ে ভারতের গর্বের জায়গাটি বিশ্বজুড়ে প্রচার পাচ্ছে এই ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ চলাকালে।

দেশগুলোর সাথে বন্ধুত্ব:

‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ চলাকালেই বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও ভারতের সম্পর্ক ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতীয় মিশনগুলো এক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। এর মাঝে অন্যতম ভারত ও ভিয়েতনামের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি, বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন সহ প্রভৃতি উদ্যোগ।

গত ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তী উপলক্ষ্যে ভিয়েতনামে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত প্রণয় ভার্মা এক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আয়োজন করেন। এই অনুষ্ঠানটির সফল বাস্তবায়নে ভিয়েতনামের ইয়েন বাই প্রদেশে যান তিনি। রাষ্ট্রদূত ভার্মা বৃক্ষরোপণকে প্রজন্মের জন্য ভারত-ভিয়েতনাম বন্ধুত্বের প্রতীক এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্য দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার চিহ্ন হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন।

একইভাবে, গত বছরের নভেম্বরে নেপালে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বিনয় মোহন কোয়াত্রা এবং নেপালের সংস্কৃতি, পর্যটন ও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী প্রেম বাহাদুর আলে ‘পশুপতিনাথ-কাশী বিশ্বনাথ অমৃত মহোৎসব মোটরসাইকেল র‌্যালি’-এর উদ্বোধন করেছিলেন।

তাই বলা যায়, বিশ্বজুড়ে ভারত গত ১২ মার্চ ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ আরম্ভ হওয়ার পর থেকে যেভাবে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে, তা অসামান্য এবং অভাবনীয়। এই অর্জন গোটা ভারতবাসীর। এই অর্জন সকল ভারতীয় মিশনের। এই অর্জন সরকারের। এই অর্জন আমাদের। তাই আমাদের উচিত ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ -কে ধারণ করে এর প্রকৃত উদ্দেশ্যের সফল বাস্তবায়ন ঘটানো।