পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং দেশটির উপর বৈদেশিক ঋণের মাত্রা অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় সিপিইসি প্রকল্পে আরও বিনিয়োগে দুবার ভাবতে হবে চীনকে।

চীন ও পাকিস্তানের মধ্যকার কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর, যা সিপিইসি নামেই সমধিক পরিচিত। সম্প্রতি গত ১৯ জানুয়ারী পাকিস্তানের সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়ার সাথে দেখা করেন সেখানে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত নং রং। সাক্ষাৎকালে এই চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে তাদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহে ঘটনাটির আঞ্চলিক গুরুত্ব ব্যাপক। কেননা, নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং দেশটির উপর বৈদেশিক ঋণের মাত্রা অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় সিপিইসি প্রকল্পে আরও বিনিয়োগে দুবার ভাবছে চীন। তাই ধারণা করা হচ্ছে, এখানে অধিক বিনিয়োগ না করা কিংবা গুটিয়ে নেয়ার বিষয়ে আলোচনা করতেই একত্রিত হয়েছিলেন নং রং এবং জাভেদ বাজওয়া।

পাকিস্তানের বহুল প্রচারিত দৈনিক ডন-এ সম্প্রতি প্রকাশ হয়, “গত তিন বছরে চীন থেকে বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রাপ্তি এবং সম্প্রসারণের দরূণ প্রথম দিকে একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে দারুণভাবে কাজ চলছিলো। কিন্তু সিপিইসি বাস্তবায়নের দ্বিতীয় ধাপে বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের সম্মুখীন হচ্ছে।”

এদিকে, চীনের অর্থায়নে হতে চলা করাচি-পেশোয়ার রেললাইন আপগ্রেড প্রকল্পও হঠাৎ করেই আটকে গিয়েছে। জানা গিয়েছে প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থ আটকে দিয়েছে চীন। এ নিয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান জানান, “এই প্রকল্পের কাজের সঙ্গে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ জড়িত। দুই দেশই এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে মধ্য পাকিস্তানে বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো প্রকল্প গুলো সম্পাদন একটু বিলম্বিত হতে পারে।”

সাম্প্রতিক হিসেব নিকেশ থেকে আমরা জানতে পারি, পাকিস্তানের চলমান চারটি জ্বালানি প্রকল্প যেমন: ৮৮৪ মেগাওয়াট সুক্কি-কিনারি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, ৭২০ মেগাওয়াট করোট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, ৩৩০ মেগাওয়াট থার তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প-১, ১৩২০ মেগাওয়াট থার তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প-২ -এর কাজ প্রায় ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছিলো শীঘ্রই হয়তো এই প্রকল্পসমূহের কাজ সমাপ্তির দিকে এগোবে। কিন্তু হঠাৎ করেই চীন সিপিইসি বাস্তবায়নে অর্থায়ন কমিয়ে দেয়ার দরুণ প্রকল্প গুলোর কাজ বাস্তবায়ন নিয়ে ধুয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়াও, থাকোট-রাইকোট সড়ক এবং ঝাব-কোয়েটা সড়ক- নির্মাণের জন্য চীন যে বরাদ্দ দিবে বলেছিলো, সেটা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। চীন থেকে প্রাপ্ত অর্থাদিরও ছাড়পত্র পাচ্ছেনা পাকিস্তান। পাক কর্মকর্তাদের অব্যহত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এবং দফায় দফায় বেইজিং এর সঙ্গে বৈঠকের পরও কোনো সুরাহা না হওয়ায় চলমান সকল প্রকল্পই অচলাবস্থায় পড়েছে।

অনুরূপভাবে, কাজ আটকে গিয়েছে গোয়াদর স্মার্ট সিটি মাস্টার প্ল্যানের অধীনে শুরু হওয়া প্রকল্পসমূহের। পাকিস্তানের দৈনিক দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পগুলো এখনও শুরু করা হয়নি। চীনা কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা সম্পর্কে সতর্ক। গত সপ্তাহে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ প্রায় ৫৬২ মিলিয়ন ডলার কমে বর্তমানে ১৭০৩৫ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তাই স্বভাবতই সদা সতর্ক চীন আটকে দিয়েছে তাঁর সকল প্রকল্পে অর্থায়ন।

এর আগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে সৌদি থেকে তিন হাজার মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা পেয়েছিলো পাকিস্তান। রয়টার্সের প্রতিবেদন মোতাবেক, এই সহায়তা পরিশোধে প্রায় চার শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে পাক সরকারকে। এছাড়াও, স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে পঞ্চাশ ট্রিলিয়ন অতিক্রম করেছে। ইতোমধ্যে এই ক্রমবর্ধমান ঋণের হারকে জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।

তাই ধারণা করি, চীন আশঙ্কা করছে যে পাকিস্তানকে আরও আন্তর্জাতিক ঋণ দেয়ার ফলে একদিকে যেমন দেশটির আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটবে, অন্যদিকে পরিশোধেও হবে অসমর্থ। ফলত, সিপিইসি প্রকল্পে আর নতুন কোনো তহবিল বরাদ্দে রীতিমতো গরিমসি করছে বেইজিং।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে ধুঁকতে থাকা পাকিস্তানের অবকাঠামোর উন্নয়নে এগিয়ে আসে চীন৷ পশ্চিম চীনের সঙ্গে দক্ষিণ পাকিস্তানের গদারকে যুক্ত করে মহাসড়ক নির্মাণ করে দেশটি৷ চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসির অধীনে প্রাথমিকভাবে ৪৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা থাকলেও ইতোমধ্যে তা ৬৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে৷ কিন্তু আর্থিকভাবে কোনঠাসা পাকিস্তান এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে সাম্প্রতিককালে এসে চীন নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে হয়তো।

নিজ কর্মীদের নিরাপত্তা ইস্যুতে চীনের উদ্বেগ বরাবরই সর্বোচ্চ। সিপিইসি প্রকল্প থেকে চীন নিজেদের গুটিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে এটিও অন্যতম নিয়ামক ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তানের ঢিলেঢালা নিরাপত্তা নিয়ে একদমই খুশি নয় জিনপিং নেতৃত্ব। গত বছরও জুলাই মাসে খাইবার পাখতুনখোয়ায় দাসু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে চীনা প্রকৌশলীদের বহনকারী একটি বাসে হামলায় নয়জন চীনা নাগরিক নিহত হয়। ২০২১ সালেরই এপ্রিল মাসে আরেকটি হামলায় কোয়েটার একটি হোটেলকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা। ঘটনাক্রমে সেই হোটেলে অবস্থান করছিলেন পাকিস্তানে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত।

তাই স্বভাবতই উদ্বীগ্ন চীন। আর দুইয়ের মেলবন্ধনেই হয়তো সাম্প্রতিককালে পাক সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে বসেন চীনা রাষ্ট্রদূত। তবে বলাই বাহুল্য, সিপিইসি প্রকল্প বাচিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে পাকিস্তান। ইতোমধ্যে তাদের তোড়জোড় শুরু করতেও দেখেছি আমরা। বেইজিং ভ্রমণেও গিয়েছেন ইমরান খান। শীতকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও যোগ দিতে দেখা যায় তাঁকে। কিন্তু সামগ্রিক বাস্তবতায় সিপিইসি প্রকল্পের বিনিয়োগে দ্বিধায় চীন?