লঙ্কান প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারত এবং শ্রীলঙ্কার অব্যাহত দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন ভারতীয় হাইকমিশনার।

শ্রীলঙ্কার নতুন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের সাথে দেখা করেছেন দেশটিতে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার গোপাল বাগলে। ১৩ মে, শুক্রবার, লঙ্কান প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারত এবং শ্রীলঙ্কার অব্যাহত দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন ভারতীয় হাইকমিশনার।

জানা গিয়েছে, বিক্রমাসিংহকে ভারতের শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানিয়েছেন হাইকমিশনার বাগলে। শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় হাইকমিশন টুইটারে বলেছে, বিক্রমাসিংহের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন বাগলে। এসময়, বাগলে শ্রীলঙ্কার সমস্ত জনগণের মঙ্গলের জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং স্থিতিশীলতার জন্য ভারত-শ্রীলঙ্কা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

উল্লেখ্য, আর্থিক সঙ্কটে বিপন্ন শ্রীলঙ্কাকে উদ্ধার করতে ষষ্ঠবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। তিনি শ্রীলংকার ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির (ইউএনপি) নেতা। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শপথ নিয়েছেন তিনি।

কারণ গোতাবায়ার পদত্যাগ ছাড়া জাতীয় ঐক্যের সরকারে যোগ দেবে না বিরোধী দলগুলো। বৃহস্পতিবারও কারফিউ উপেক্ষা করে কলম্বোয় গোতাবায়ার কার্যালয়ের বাইরে বিক্ষোভ হয়েছে।

বিক্ষোভকারীরা বলছেন, রাজাপাকসের পরিবারের কাউকে সরকারে দেখতে চান না তারা। এদিকে বিক্ষোভকারীদের ওপর সোমবারের হামলার ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে ও তার ছেলে নামাল রাজাপাকসেসহ ১৭ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত।

এর আগে বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে শিগগিরই নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিলেন গোতাবায়া। তিনি দেশবাসীকে শান্তি বজায় রাখারও আহ্বান জানান।

ভাষণে গোতাবায়া বলেন, চলতি সপ্তাহেই নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হবে। নতুন যিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন তিনি দেশবাসীর আস্থা অর্জন করবেন। সংবিধান সংশোধন করে গোতাবায়া তার বেশির ভাগ নির্বাহী ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন।

শ্রীলংকার নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সবচেয়ে বেশি শোনা গিয়েছিলো প্রধান বিরোধী দল সামাজি জানা বালাওয়েগয়ার (এসজেবি) নেতা সাজিথ প্রেমাদাসার নাম। কিন্তু তিনি জানিয়েছিলেন, গোতাবায়া ক্ষমতায় থাকলে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন না তিনি।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে গোতাবায়া এসজেবির সংসদ সদস্য শরৎ ফনসেকারের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তাকেও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনিও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, গোতাবায়ার অধীন কোনো দায়িত্ব নেবেন না তিনি।

এছাড়া নতুন সরকার গঠন নিয়ে এসজেবির পক্ষ থেকে চারটি শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়। প্রথমত, প্রেসিডেন্টকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পদত্যাগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রেসিডেন্ট নতুন সরকারের কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

তৃতীয়ত, নির্বাহী প্রেসিডেন্টের পদ বিলুপ্ত করতে হবে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হওয়ার পর চতুর্থ সাধারণ নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু তাতে রাজি হননি গোতাবায়া। এরপর তিনি ধরনা দেন নিজ দলের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের কাছে।

বুধবার রাতে তার সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শপথ নেওয়ার পর কলম্বোয় একটি মন্দির পরিদর্শনে যান রনিল বিক্রমাসিংহে। রনিল বিক্রমাসিংহে এর আগেও পাঁচবার দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

সর্বপ্রথম ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বিক্রমাসিংহে। এরপর ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল, ২০১৫ থেকে ২০১৫ (১০০ দিন), ২০১৫ থেকে ২০১৮ এবং ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি লংকান প্রধানমন্ত্রীর পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০১৮ সালের অক্টোবরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করেন। কিন্তু এর দুই মাস পরেই তাকে আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এদিকে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিতে কারফিউ উপেক্ষা করে বৃহস্পতিবারও কলম্বোয় তার কার্যালয়ের বাইরে বিক্ষোভ হয়েছে। এ সময় অন্তত ১২ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। করোনার ধাক্কার পাশাপাশি সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্তে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্দশার মুখে পড়ে শ্রীলংকা। কয়েক মাস ধরে খাবার, জ্বালানি ও ওষুধের তীব্র সংকটে পড়েছে দেশটি।

ব্যাপকভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, চলছে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট। ঋণের চাপ আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। এ পরিস্থিতিতে সরকার পতনের দাবিতে এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশটিতে বিক্ষোভ চলছে।

শুক্রবার থেকে শ্রীলংকায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। বিক্ষোভের লাগাম টানতে এরপর জারি করা হয় কারফিউ। সোমবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে রাজাপাকসের অনুগত কয়েক ডজন ব্যক্তির বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। হামবানটোটায় রাজাপাকসের পৈতৃক বাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়।

অচলাবস্থা নিরসনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে মাহিন্দা রাজাপাকসেকে পদত্যাগ করতে বলেন শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। এরপর সেনা পাহারায় মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ছাড়েন মাহিন্দা।

মাহিন্দা ও তার ছেলেসহ ১৭ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা : শ্রীলংকার পদত্যাগকারী প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে ও তার মিত্রদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার মাহিন্দা, তার রাজনীতিবিদ ছেলে নামাল রাজাপাকসেসহ ১৭ জনকে দেশত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন স্থানীয় একটি আদালত।

সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতার অভিযোগে তাদের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সোমবার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার তদন্ত করতে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন কলম্বোর ম্যাজিস্ট্রেট।

ওই হামলায় ৯ জন নিহত ও দুই শতাধিক লোক আহত হয়েছিলেন। আদালতের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদালতে একটি আবেদনে রাজাপাকসে ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

৭৬ বছর বয়সি মাহিন্দা রাজাপাকসে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পলায়নের পর শ্রীলংকার পূর্বাঞ্চলীয় একটি নৌঘাঁটিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে। মঙ্গলবার তার ছেলে নামাল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তার বাবার দেশত্যাগ করার কোনো পরিকল্পনা নেই। খবর: ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক